২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার

৫২ ভাষা আন্দোলনের সৈনিক কুলাউড়ার একই পরিবারের তিন বোনের রাষ্ট্রীয় মুল্যায়ন চায় তাদের পরিবার

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

ফেইসবুক শেয়ার করুন

ডেক্স রিপোর্ট ঃ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল মাতৃভাষাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার জাতীয় আন্দোলন। জাতীয় এই আন্দোলনে বাংলাকে রাষ্টীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে সব প্রতিবাদী নারী নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ একজনের নাম ছালেহা বেগম। ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। জন্ম-১৯৩৫ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর। বাড়ী সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার উছলাপাড়া গ্রামে। বাবা সাব রেজিষ্টার এ এম আশরাফ আলী সরকারী চাকুরীর কারণে ঐ সময়ে পিরোজপুরে পোষ্টিং ছিল । তিন বোন ও দু’ভাই এর মধ্যে ছালেহা বেগম তৃতীয়। বড় বোন রওশন আরা বাচ্চু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মেয়েদের রোকেয়া হলে থাকতেন। দর্শনে অনার্স পড়ার সুবাদে বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসাবে ছাত্র রাজনীতি ও তখনকার চলমান মাতৃভাষা আন্দোলনের সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। মেজো বোন হোসনে আরা বেগম ১৯৪৮ সালে পিরোজপুর আরবান গার্লস স্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। কায়েদে আজম ঢাকায় এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষনার প্রতিবাদে ১৯৪৮ ইং এর ১১ই মার্চ স্কুল থেকে ধর্মঘটের আহ্বান করায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন।
ছালেহা বেগমকে ময়মনসিংহে থাকতে হতো স্কুলের হোস্টেলে। সেখানকার অভিবাবক হিসেবে ছিলেন তাদের মামা। সি এ মান্নান যিনি বন বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে ময়মনসিংহে কর্মরত ছিলেন। ছালেহা বেগম এর পরিবার ছিল শিক্ষানুরাগী ও রাজনীতি সচেতন। ছালেহা বেগম ছিলেন দশম শ্রেণীর অন্যতম মেধাবী ও সাহসী ছাত্রী। তিনি ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের খেলাধুলা ও সাতারে চ্যাম্পিয়ন থাকার সুবাদে সবকিছুতেই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতেন। ছোট ক্লাসের মেয়েরাও ছালেহা বেগমকে তাদের বড় বোনের মত শ্রদ্ধা করত।
১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী বৃহঃস্পতিবার। ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে পুলিশ গুলি বর্ষন করে। শহীদ হন অনেকে। সর্বত্র বিক্ষোভ। সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ময়মনসিংহেও। ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীরা সেদিন ক্লাসে যোগ দেয়নি। তারা বিদ্যালয়ে উঠিয়ে দেয় কালো পতাকা। মিছিল বের করে কালো পতাকা হাতে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করে তারা। ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীদের সংগঠিত করার মূল কারিগর ছিলেন এই ছালেহা বেগম। কালো পতাকা হাতে নিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিদ্যাময়ী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হাসিনা খানমের কঠিন প্রহরা ভেঙ্গে সেই স্কুলের ছাত্রীদের ও মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীদেরকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে মূল আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছালেহা বেগম একাই কাধে তুলে নেন মেয়েদের নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব। সারাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর মত “ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাই স্কুলেও” বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে কালো পতাকা উত্তোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ছালেহা বেগম একাই। সরকারী অফিসার এর মেয়ে বলে মারধর করা হয়নি, কিন্ত কথার ধারালো তীর ছালেহা বেগমের বুকে বিদ্ধ করাতে সেদিন দ্বিধা করেননি স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং জেলা মেজিস্ট্রেট ও ডিসি এম. এ মজিদ। যার হুকুমে ছালেহা বেগমকে স্কুলের নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গের অযুহাতে কঠিন শাস্তি স্বরূপ তিন বছরের জন্য বহিস্কার ঘোষনা করা হয়। লজ্জায় গ্লানিতে ফেটে তখন ছালেহা বেগমের মনে হয়েছিল “ছাত্র জনতার গুলি খেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল” তা হলে হয়তো ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের গুলির প্রতিবাদে কালো পতাকা উত্তোলনের দায়ে স্কুল ত্যাগের মতো এতো বড় লজ্জা মাথা পেতে নিতে হতো না, এই লজ্জা যে, প্রাণত্যাগ এর চেয়ে ভয়াবহ কষ্টের, অপমানজক, তা হলো একজন মেধাবী ছাত্রীর “ছাত্রত্ব” হারিয়ে মা বাবার কাছে ফিরে যাওয়া। ছালেহা বেগমকে ২৫ শে ফেব্রুয়ারী স্কুল ত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিন বছর পর ছোটদের সাথে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার মত মন মানসিকতা ও পরিবেশ তখন ছিলনা বলেই পরবর্তীতে কোন স্কুলেই আর তাকে ভর্তি করানো হয়নি। ফলে তার আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হয়ে উঠেনি এবং অল্প বয়সেই ছালেহা বেগমকে বসতে হয়েছিল বিয়ের পিড়িতে। ছালেহা বেগমের পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে কেউ কেউ তার গৌরবোজ্জল অবদানকে হেয় করে কারো কাছে প্রকাশ করা থেকে সর্বদাই তাকে বিরত রাখতেন। ফলশ্রুতিতে পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে ছালেহা বেগম সন্তানদের ছাড়া আর কারো কাছে তার এই ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জল অবদানের কথা প্রকাশ করেননি সেটাও ছিল খুবই যৎসামান্য। ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলে সেই অনাকংখিত বহিস্কার আদেশের কথা মনে হলেই চোখে জল আসত ছালেহা বেগমের চুপ করে একা একা কাদতেন, অন্য আর দশটা ছাত্রীর মত তারও নিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে মেট্রিক পাশ করে কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ার অদম্য বাসনা ছিল এবং স্বপ্ন ছিল অনেক বড় কিছু হওয়ার। কিন্ত ময়মনসিংহের অনাকংখিত বহিস্কার আদেশের জন্য তার জীবনে নেমে আসে নির্মম পরিহাস। তাই ছালেহা বেগম এর স্বপ্ন অংকুরেই শেষ হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে ছালেহা বেগম এতই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন যে বরাবরই তিনি প্রত্যেক ক্লাসে মেধা তালিকায় থাকতেন এবং সাহিত্য চর্চা খেলাধুলাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সব সময় প্রথম স্থান লাভ করে প্রচুর পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তৎকালীন দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখার অভিজ্ঞতা নিয়েই ১৯৫৮ সালে তিন বোন অর্থাৎ ছালেহা বেগম ও তার দুই বোন রওশন আরা বাচ্চু ও হোসনে আরা বেগম এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মেয়েদের পড়ালেখার কথা চিন্তা করে কুলাউড়া উছলাপাড়া নিজ বাড়ীর সামনেই “আমতৈল’ এর হেড স্যার ‘বিধু বাবুর’ সহায়তায় মাত্র ১১ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু হয় কুলাউড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যলয়ের যাত্রা। যাঁর প্রথম প্রধান শিক্ষয়ীত্রি ছিলেন বড় বোন রওশন আরা বাচ্চু এবং তার সাথে তার ছোট দুই বোন ছালেহা বেগম ও হোসনে আরা বেগম এর সর্বাত্মক সহযোগীতায় বিনা বেতনে মেয়েদের পড়ানো শুরু করেন কুলাউড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেই স্কুলেই বর্তমানে ছাত্রী সংখ্যা হাজারেরও বেশী। প্রতি বছর রেজাল্টও ভাল করে আসছে। স্কুলের ছাত্রীদের ভাল রেজাল্টের খবর শুনলে ছালেহা বেগম সর্বদাই আনন্দিত হয়ে উঠতেন। সেই সময়ের দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিয়েই ছালেহা বেগম শুরু করলেন শিক্ষকতা। ছালেহা বেগম ১৯৬১ ইং সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ তাড়াইলের সেকান্দার নগর নিবাসী সৈয়দ আব্দুল আহাদ মশ্কূর এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। উক্ত সৈয়দ আব্দুল আহাদ (মশ্কুর) পূর্ব পুরুষ ছিলেন হয়রত শাহ জালাল (রাঃ) ৩৬০ আওলীয়া খ্যাত সিলেট কুমার পাড়ার হযরত হামজা (রাঃ)। উল্লেখ্য সৈয়দ আব্দুল আহাদ ছিলেন একজন চলচিত্র সাংবাদিক, “ফিল্ম ইন্সটিটিউট এন্ড আর্কাইভ এর একজন চলচ্চিত্র সংগ্রাহক, কলামিস্ট চলচিত্র গবেষক ও লেখক। ছালেহা বেগমকে বিয়ের পর চলে যেতে হয় স্বামীর কর্মস্থল উত্তরবঙ্গে। প্রথমে রংপুর তারপর দিনাজপুরে তারপরে কুষ্টিয়ায়। ১৯৬৫ সালে তিনি চলে আসেন স্বামীর মাতুলালয় হয়বৎ নগর দেওয়ান বাড়ী কিশোরগঞ্জে। জীবনের বাকি সময় তিনি সেখানে কাটান এবং পুরোটা সময় স্বামী সংসার এর পাশাপাশি শিক্ষকতা ও সেলাই, বয়স্ক শিক্ষা ইত্যাদি সামাজিক কর্মকান্ডে আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ছালেহা বেগম সংসার জীবনের পাশাপশি সবসময় তার সৃষ্টিশীল কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কিশোরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষায়িত্রী ফাতেমা ইসলামকে সাথে নিয়ে খরমপষ্টি এলাকায় ১৯৭৮ সালে গড়ে তোলেন কিশোরগঞ্জের প্রথম “বয়স্ক নারী শিক্ষা কেন্দ্র” যা কিশোরগঞ্জের, খরমপট্টি, শোলাকিয়া, গাইটাল, হারুয়া, হয়বৎ নগর, নগুয়া, বত্রিশ, নিউটাউন, বউলাই ইত্যাদি অনেক এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন তোলে। মহিলাদের যারা পড়াশুনায় আগ্রহী এবং বয়স্ক, তারা বিনা বেতনে এই অবৈতনীক স্কুলে পড়াশুনা করতে আসতে থাকেন। কিন্ত সময়ের বিবর্তনে ও অর্থনৈতিক সহযোগীতার অভাবে বয়স্ক নারী শিক্ষা কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। নারী শিক্ষার প্রসার ও মেয়েদের স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য ছালেহা বেগম সবসময়ই পালন করেছেন অগ্রনী ভূমিকা। যাতে পুরুষের পাশাপাশি গৃহিনীরা নিজস্ব অঙ্গনে থেকে কিছু উপার্জন করে স্বনির্ভর হন এবং সংসারে অর্থনৈতিক সহযোগীতা বৃদ্ধি করতে পারেন। সর্বগুণে গুনান্নিতা ছালেহা বেগমের কর্মময় জীবন ও তার উচ্চ মানবিকতা বোধ আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত।
উল্লেখ্য যে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছালেহা বেগম নিজের ২ ছেলে ও ২ মেয়েকেও লেখাপড়া করে শিক্ষা দান করে যান। তার বড় মেয়ে এডভোকেট সৈয়দা ফেরদৌস আরা দীর্ঘদিন যাবত আইন পেশায় নিয়োজিত, ছোট মেয়ে এডভোকেট সৈয়দা ফরিদা আক্তার আইএফআইসি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আইন বিভাগে কর্মরত আছেন। বড় ছেলে লেখক, গবেষক সৈয়দ শাকিল আহাদ ১টি বহুজাতিক কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত এবং সর্বকনিষ্ট ছেলে সঙ্গিত শিল্পী সৈয়দ ওয়াকিল আহাদ ২০১৬ সালে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কারে সর্বশ্রেষ্ঠ গায়কের পুরস্কার অর্জন করেন। ছালেহা বেগম বিভিন্ন রকম সামাজিক শিক্ষা সচেতনতামূলক কর্মকান্ডে দেশ ও দশের উন্নয়নে লিপ্ত থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট কুলাউড়ার উছলাপাড়া তার পৈত্রিক বাড়িতে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)। তার স্বামীর ইচ্ছায় পরদিন কিশোরগঞ্জ হয়বৎ নগর জমিদার বাড়ীর পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার একই পরিবারের তিন বোন তিন জায়গা থেকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ তিন বোন সমগ্র বাঙ্গালী জাতির গৌরব এরা রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন কোন বড় পুরস্কারে ভূষিত হননি। বাংলা ভাষা আজ বিশে^র দরবারে পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার সম্মান। ছালেহা বেগম এত অল্প বয়সে যে অবদান রেখেছেন তা বিরল। যে শাস্তি পেয়েছেন তাও বিরল। নিরবে নিভৃতে চলে গেলেন প্রচার বিমুখ ভাষা কন্যা ছালেহা বেগম, কিন্ত ছালেহা বেগমের অবদানের কোন মূল্যায়ন হয়নি কিংবা শাস্তিও প্রত্যাহার হয়নি। তাই বিশিষ্ট জনের দাবী, ছালেহা বেগমের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিরল নেতৃত্ব প্রদানের জন্য ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত তৎকালীন বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার এবং তার জন্য ভাষা আন্দোলনের সর্বোচ্চ মরণোত্তর সম্মান প্রদর্শন করা হোক।

1715 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন