ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৬ ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

সিলেটের গর্ব কুয়েতের রাষ্ট্রদূত মেজর আস্হাব উদ্দীন এর বিদায়ী সম্ভাষণে আত্নজীবনী


নাসরিন আক্তার মৌসুমী, কুয়েত থেকেঃ  সুন্দর-সুবর্ণ,তারুন্য-লাবণ্য, অপূর্ব রুপসী,রুপে যে অনন্য। এটা শুধু গানের কলিতেই নয়। কারণ বাংলার পথ-ঘাট,মাঠ- প্রান্তর অপূর্ব রুপে সজ্জিত। তাই অনেক কবি, লেখক এবং গায়ক,তাদের লেখার মাধ্যমে,কবিতার মাধ্যমে এবং গানের মাধ্যমে এই অপূর্ব রুপসী বাংলার গুন-গান গেয়েছেন এবং গাইছেন। আজ আমরা কথা বলবো এমনই একটি জেলাকে নিয়ে যার গুন গান লিখে শেষ করা যাবে না। রুপ মাধূর্যে ভরা,বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সেই জেলাটির নাম হলো সিলেট জিলা। এই সিলেট জেলাতে জন্ম হয়েছে একজন কৃতি সন্তানের। মিসেস মরিয়ম বেগমের কোল জুড়ে আসল সেই সন্তানটি। আর তার নাম হলো মেজর আস্হাব উদ্দীন । জন্ম ২৮ শে অক্টোবর ১৯৫৮ সাল। গ্রাম-মাটিজুরা,ইউনিয়ন- তিলপাড়া, উপজেলা-বিয়ানীবাজার, জেলা সিলেট। যদিও তার জন্ম সিলেটে। কিন্তু তার বেড়ে উঠা চিটাগাংয়ে। শৈশব- কৈশোর তার কেটেছে চিটাগাংয়ে বাবার চাকরীর সুবাদে। প্রাথমিক বিদ্যালয় কাপ্তাইয়ের একটা স্কুলে। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজ চিটাগাং। ব্যাচলর অফ আর্টস ফ্রম চিটাগাং ইউনিভার্সিটি। ধীরে ধীরে বাবা মার ছায়ায়,মায়ায় বেড়ে উঠেন প্রাকৃতিক লীলা ভূমিতে মেজর আস্হাব উদ্দীন । এবং বাবা-মার স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। সেই ছোট্ট মেজর আস্হাব উদ্দীন বেড়ে উঠার সাথে সাথে নামটাও যেন বেড়ে উঠতে থাকে। আস্হাব উদ্দীন একনিষ্ঠ অধ্যাবসায়ের কারনে সে তার লক্ষ্যে পৌছে যায়। এবং মেজর আস্হাব উদ্দীন থেকে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসহাব উদ্দিন (এনডিসি,পিএসসি)তে রুপ নেয়। এই গর্ব শুধু বাবা-মার নয়,পুরো জাতির। তার অক্লান্ত পরিশ্রমেই তাকে আজকে এ জায়গায় নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। আর্মিতে কমিশন প্রাপ্ত ১৯৭৯ সালে। মার্স্টাস অন পলিটিক্যাল সায়েন্স। মাস্টার্স অন ডিফেন্স স্টাডিজ ফ্রম ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি। রিসিভডএম,ফিল ফ্রম ইউনিভার্সিটি অফ মাদ্রাজ। ইন্ডিয়া অন ডিফেন্জ এন্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সায়েন্স কোর্স এন্ড ডিফেন্স এর ট্রেইনিং নিয়েছেন। নবম পদাতিক ডিভিশন সাভারের জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং)ও সাভারের এরিয়া কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ পদাতিক ডিভিশন চট্টগ্রাম এর জিওসি ও এরিয়া কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রিন্সিপাল ষ্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট এর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ শ্যূটিং ফেডারেশন,গলফ এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্স এর দায়িত্ব করেন। বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া এমন আরো অনেক কিছুর দায়িত্ব পালন করেন। সেনাবাহিনীতে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। এবং অবসর গ্রহন করেন ২০১৩ সালে। তবে তিনি অবসর পাওয়া সত্ত্বেও তাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দেন নি। তাই ২০১৩ সালেই সেনাবাহিনী থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে চাকরি স্হানান্তর করা হয়। মেজর জেনারেল মেজর আস্হাব উদ্দীন বিয়ে করেন ১৯৮৮ সালের ২৯শে ফেব্র“য়ারীতে। তার সহধর্মিণী হয়ে ঘরে আসেন মিসেস ফাইকা আসহাব। বাবা- মার হাত ধরে সন্তান যেমনি সামনের দিকে এগিয়ে যায়,এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য বাবা-মার অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার লক্ষ্যে পৌছে দেয়, তেমনি করে একজন সহধর্মিণীর অনেক কিছু ত্যাগ স্বীকার করার কারনে সমাজ তথা মানুষ তার কাছ থেকে ভালো ভালো কাজ পেয়ে থাকেন। তাদের সংসারে এক ছেলে এবং এক মেয়ে। মেয়ে হলো ফারিয়া এবং ছেলে হলো ফারহান। যেহেতু স্বামী সেনাবাহিনীতে তাই শুরু থেকেই ফাইকা আসহাব তার সংসারের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া থেকে শুরু করে যাবতীয় সংসারের সব দায়িত্ব তিনি একাই পালন করেন। এবং সেটা তিনি সঠিক ভাবে পালন করেছেন। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আস্হাব উদ্দীন ২০১৩ সালে কুয়েতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগদান করেন এবং সাফল্যের সাথে তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন। কুয়েত প্রবাসীদের তিনি অনেক কিছু উপহার দিয়ে গেছেন যা কুয়েত প্রবাসী কোনদিন ভুলবেন না। মান্যবর রাষ্ট্রদূতের একটাই লক্ষ্য ছিল আর সেটা হলো সব বাংলাদেশীদের একসাথে করে কাজ করা।এবং দেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখার জন্য কাজও করে গেছেন সবাইকে সাথে নিয়ে।বহুদিনের স্বপ্ন কুয়েতের বুকে একটা বাংলাদেশী স্কুল প্রতিষ্ঠা করার।এবং সেটা তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাতৃভাষাকে ভালোবাসার কারনে কুয়েতের রেডিওতে নিজের দেশের ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। এতে করে বাংলাদেশীরা পেয়েছে বাংলা ভাষার গান,কবিতা,নাটক ইত্যাদি। এবং মরুর বুকে সপ্তাহে তিন দিন তারা বাংলা অনুষ্ঠান শুনতে পেয়ে মহা খুশি। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশীদের জন্য আমাদের মান্যবর রাষ্টদূতের অনন্য অবদান হলো এই রেডিও কুয়েত।সেই সাথে খেলাধূলা,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এনেছেন নতুন মাত্রার বৈচিত্র্য। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরার চেষ্টা করেছন। যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সফলতা পেয়েছেন।
মেজর জেনারেল আস্হাব উদ্দীন ব্যক্তি জীবনে খুবই সহজ সরল জীবন যাপন করেন। খাওয়া দাওয়ায় তার কোন বিলাসিতা নেই। ঘরে যা কিছুই রান্না করা হয় তাই তিনি খেতে পছন্দ করেন। তবে কোন এক সময় গরুর গোশত খেতে পছন্দ করতেন। সেই সাথে তিনি টাকি মাছের ভর্তা পছন্দ করেন।খুবই নিয়মের মধ্যে চলাফেরা করেন। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে একটু কোরআন তেলওয়াত করেন।এভাবেই তিনি তার দিনটা শুরু করেন। আড়াই বছরে তিনি কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেক কিছু উপহার দিয়ে গেছেন। এখন তার বিদায়ী সুর বাজছে সব জায়গাতে।তার গুন গান গাইছেন সবাই। সুশীল সমাজ তাকে অনেক সম্মাননা প্রদান করছেন।এবং তিনি যে খুব ভালো মানুষ সেটাও অকপটে স্বীকার করছেন সবাই।এবং অনেকে তার বিদায় উপলক্ষ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলছেন।এখন কথা হলো তিনি যে কুয়েতের এই সমাজে এতো ভালো ভালো কাজ করে গিয়েছেন যা সত্যিই অতুলণীয়। কুয়েত প্রবাসীরা কি ধরে রাখতে পারবেন তার চলে যাওয়ার পরে? মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আস্হাব উদ্দীন একটাই স্বপ্ন আর সেটা হলো কুয়েত প্রবাসী সকল বাংলাদেশীদের একসাথে করা। এবং একজন আরেকজনের পাশে থাকা। থাকবে না কোন ভেদাভেদ আর বৈষম্য।যতটুকু পেরেছেন তিনি ততোটুকু করে গিয়েছেন। তিনি তার সরল মনে চেষ্টা করে গিয়েছেন।তিনি চলে যাওয়ার পরে কি আবার ফিরে আসবে সেই দাম্ভিকতা,বৈষম্য এবং ভেদাভেদ?মেজর জেনারেল আস্হাব উদ্দীন এই আড়াই বছরের কাজ গুলো তখনই স্বার্থক হবে যখন তার দেখানো পথে সবাই সেই কাজ গুলোকে ধরে রাখবে। মানুষ কোথাও চিরস্থায়ী নয়। তাই কোথাও না কোথাও থেকে তাকে বিদায় নিতে হবেই। আর বিদায়টা যদি হয় সুখকর তাহলে তো কোন কথাই নাই। তিনি সবাইকে যেমন ভালোবেসেছেন তেমনি সবার ভালবাসাও পেয়েছেন। তিনি সবার মাঝে বেচে থাকবেন তার কর্মের গুনে। আর তার এই গুনটা যেন জীবনের শেষ অবধি পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন আমরা এই দোয়াই করি।এবং আপনার সন্তানরাও যেন সমাজে আপনার মতোই ভালো ভালো কাজ উপহার দিতে পারে আমরা তাদের কাছে এই প্রত্যাশাই করি। যেখানেই থাকেন ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন। আমাদের কুয়েত প্রবাসীর পক্ষ থেকে আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করে, আপনাকে বিদায় জানাচ্ছি।

Major ashab uddin (1) major ashab uddin 2

নিউজটি শেয়ার করুন

error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ