সেপ্টেম্বর ২, ২০১৫ ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ

পদত্যাগ করলেন লতিফ সিদ্দিকী- দেখেনিন লতিফনামার যবনিকাপাত


টানা একবছর ধরে চলা সব আলোচনা, সমালোচনা ও  জল্পকল্পনার অবসান ঘটলো মঙ্গলবার। যুক্তরাষ্ট্রের এক অনুষ্ঠানে ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী।  এর জেরে হারিছেন মন্ত্রিত্ব, খুইয়েছেন দলের সদস্য পদও। অপেক্ষা ছিল কবে হারাবেন সংসদ সংদস্য পদটিও। এ নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ছিল আওয়ামী লীগ, সংসদ ও নির্বাচন কমিশন।

অবশেষে ৭৫ কার্যদিবস পর জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নতমস্তকে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন লতিফ সিদ্দিকী। বিতর্ক সৃষ্টির পর খানিকটা ঔদ্ধত্যের সঙ্গেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও মঙ্গলবার বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমা চাইলেন তিনি। আর এর মধ্য দিয়ে যবনিকা ঘটলো ‘লতিফ সিদ্দিকী অধ্যায়ের’।

শুরুটা যেভাবে
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে টাঙ্গাইল সমিতির এক অনুষ্ঠানে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী মহানবী (সা.), হজ ও তাবলীগ জামাতকে কটূক্তি করে বক্তব্য দিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে চিনেন না উল্লেখ করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও করেছিলেন তিনি। এ বক্তব্য নিয়ে দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ব্যাপক সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে তাকে ১২ অক্টোবর প্রথমে মন্ত্রিসভা, পরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যপদ থেকে অপসারণ করা হয়। এমনকি দলের সাধারণ সদস্যপদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়।

২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময়ই তার সংসদ সদস্যপদ খারিজ চেয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কিন্তু সে সময় চিঠি দিয়ে শুধু লতিফ সিদ্দিকীকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। পরবর্তীকালে দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

ধর্ম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগে দীর্ঘ ৭ মাস ৪ দিন কারাভোগ শেষে ২৯ জুন জামিনে মুক্তি পান লতিফ সিদ্দিকী। মুক্তির পর তিনি সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এতোদিন দলের হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। অবশেষে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন।

এক চুমুক লতিফনামা
শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, বিভিন্ন সময় বেফাঁস মন্তব্য, কটাক্ষ, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলার কারণে বিভিন্ন সময় আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের এক সময়ের এই প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য,  ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। ব্যক্তি ও ব্যক্তির অনুভূতিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যেন তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে। তার এমন আচরণে শুধু বিরোধী মতেরই নয়, নিজ দলের নেতাকর্মীরাও বারবার বিব্রত হয়েছেন।

গত সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আর কখনো নির্বাচন করবেন না জানিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নেন বিতর্কিত এ ব্যক্তি। তিনি ২০১৩ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনায় দাঁড়িয়ে লতিফ সিদ্দিকী বলেছিলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনী রাজনীতিতে আর অংশ নেবো না। তবে দলীয় রাজনীতিতে শেখ হাসিনা যে নির্দেশ দেবেন, তা সম্পন্ন করার চেষ্টা করব।’ কিন্তু সেই অঙ্গীকারেও তিনি অটল থাকতে পারেননি। তাই ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনে দলের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে গত সরকারের সময় পাওয়া পাট মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় এবার তাকে সরিয়ে স্থানান্তর করা হয়েছিল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে সজীব ওয়াজেদ জয়কে ‘চিনতে না পারলেও’ গত বছরের ১১ মার্চ ঢাকায় জয়ের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে লতিফ সিদ্দিকী জয়কে নিজের ‘মাস্টার’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে জয় কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, তা পথপ্রদর্শক হবে। কারণ তিনি যার (শেখ হাসিনা) উপদেষ্টা, তার সৃষ্টি মননশীল।’

২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমার স্বভাব খারাপ, এ জন্য মাঝে মধ্যে একটু লাঠিপেটা করি। সাপকে যদি মারতে হয়, তাহলে লাঠিপেটা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

সাংবাদিকেরা আমার বিরুদ্ধে লাগে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ‘এ দেশের ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়া, ব্যবসায়ী, কথিত সুশীল সমাজের সদস্যরা বেতনভুক ক্রীতদাস।’

একই বছরের ২৯ মে রাজধানীর শিল্পকলায় যুবলীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে আমরা কী করব? নবম জাতীয় সংসদে মোট সাতটি দল ছিল। দশম সংসদেও সাতটি দল আছে। দল তো কমে নেই। ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়নি। প্রার্থীবিহীন নির্বাচন হয়েছে।’

এর আগে ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে এক সভায় লতিফ সিদ্দিকী জামায়াতের হরতালে দলীয় নেতাকর্মীদের তৎপর না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আর বসে থাকার সময় নেই। আর কেউ হরতাল করলে তাদের বাড়িতে ঢুকে হত্যা করতে হবে। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত হরতাল করে। আর রাস্তায় শুধু পুলিশ থাকে। আমাদের নেতাকর্মীরা নেতার হুকুমের অপেক্ষায় বসে থাকে।’

তিনি ওই সময় আরো বলেছিলেন, ‘সব কিছুর জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ লাগবে কেন? যখন বাড়ি-গাড়ি করেন তখন কোথায় থাকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ? আমি বলছি, এটিই আমার শেষ বক্তৃতা।’

একই মাসের শেষ সপ্তাহে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে মন্তব্য করেছেন তা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। আমি যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতাম, তাহলে এত দিন তাকে কারাগারে থাকতে হতো।’ এছাড়া গতবছরের ২৮ মার্চ টাঙ্গাইলে নিজ বাড়িতে পিডিবির উপসহকারী প্রকৌশলী পুনয় চন্দ্রকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে ওই বছরই গাজীপুরের হাইটেক পার্কের উপসহকারী প্রকৌশলীকে পানিতে ভিজিয়ে শাস্তি দেন তিনি। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর সাবেক এই মন্ত্রী হাইটেক পার্কে প্রবেশের সময় ফোয়ারা অপরিষ্কার দেখেন। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য গাজীপুর হাইটেক পার্কের সামনে ফোয়ারা তৈরি করা হলেও তা অপরিষ্কার থাকায় প্রকৌশলীকে পানিতে নামান মন্ত্রী। ফোয়ারার পানিতে তাকে ভিজিয়ে শাস্তি দেন।

এছাড়া ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর যথাযথ মর্যাদা না দেয়ার অভিযোগ তুলে পাট নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আয়োজকদের কঠোর সমালোচনা করেন তৎকালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উপস্থিতিতে লতিফ সিদ্দিকী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা। আর আমি কি উড়ে এসেছি?’

এর কিছু দিন পর খামারবাড়িতে এক অনুষ্ঠানে কোরআন ও আজানের সমালোচনা করে বিতর্কিত এ মন্ত্রী বলেন, ‘আজানের সময় মাইক বন্ধ রাখতে হবে কেন? আর কোনো অনুষ্ঠান কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু করতে হবে কেন? কোরআন তিলাওয়াতের সাথে গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটকও পাঠ করতে হবে।’

২০০৯ সালের ১২ অক্টোবর সংসদে দেয়া এক বক্তব্যে তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদের সমালোচনা করে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘স্পিকার হচ্ছেন সংসদের সেবক। তিনি প্রভু নন।’ আবদুল হামিদকে উদ্দেশ করে তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিভা ও প্রগলভতা এক নয়।’

নিউজটি শেয়ার করুন

error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ