জুন ১৪, ২০১৫ ৯:১৬ অপরাহ্ণ

ট্রানজিটে যুক্ত হতে পারবে সার্কের অন্য দেশও


সার্ক দেশগুলোর সড়ক নেটওয়ার্কের প্রথম পর্যায়ে সড়কপথে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচলের জন্য ‘বিবিআইএন মোটর ভেহিক্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট (এমভিএ)’ চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি হয়েছে চার দেশের সচিবরা।

রোববার ভুটানের রাজধানীর থিম্পুতে অনুষ্ঠিত চার দেশের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে তারা এই এক মত প্রকাশ করেছেন। চুক্তির ফলে বাধা ছাড়াই এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্যবাহী গাড়ি যাত্রীবাহী বাস বা ব্যক্তিগত মোটরযান প্রবেশ করতে পারবে।

আগামীকাল সোমবার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে চার দেশের পরিবহনমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন ভুটানের তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এ সম্মেলনে যোগ দিতে গত শুক্রবার সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ভুটানে গেছেন। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক, যুগ্ম-সচিব আব্দুল মালেক, চন্দ্রন কুমার দে ও সেতু বিভাগের তথ্য কর্মকর্তা ওয়ালিদ ফয়েজ। এছাড়া ভুটানস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়।

জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সড়ক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত বছর নভেম্বর সার্ক সম্মেলনে আট দেশের মধ্যে সার্ক এমভিএ উত্থাপন করা হয়। তবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রস্তুতির অভাবে তা অনুমোদন হয়নি। সেই চুক্তির ভিত্তিতে বিবিআইএম এমভিএর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়।

এরপর গত সোমবার (৮ জুন) মন্ত্রিসভায় এই চুক্তিটির খড়সা অনুমোদন করা হয়। এই চুক্তির আওতায় বাধা ছাড়াই এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্যবাহী গাড়ি (ট্রাক, টেইলার), যাত্রীবাহী বাস বা ব্যক্তিগত মোটরযান প্রবেশ করতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি গাড়ির জন্য পৃথক ট্রানজিট ফি দিতে হবে। পাশাপাশি পণ্যবাহী গাড়ির জন্য পৃথক কর ও শুল্ক দিতে হবে।

এছাড়া প্রতিটি পণ্যবাহীর গাড়ির ট্রানজিটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে আর্থিক গ্যারান্টিও দিতে হবে। প্রতিটি দেশে গাড়ি প্রবেশের ক্ষেত্রে নিজ নিজ কাস্টমস নীতিমালা অনুসরণ করবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালের মধ্যে সড়কপথে মোটরযান চলাচলের জন্য আগামীকাল ভুটানের রাজধানীতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে বলে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে আরো জানা গেছে, বিবিআইএন এমভিএর আওতায় এক দেশের গাড়ি অন্য দেশের নির্ধারিত রুট ছাড়া অন্য কোনো সড়ক ব্যবহার করতে পারবে না। এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশে যাত্রী ওঠানামা করতে পারবে না। অপর কোনো দেশ অতিক্রমের সময় জ্বালানি তেল প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য পরিশোধ করতে হবে। স্থানীয় যানবাহনের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের ভর্তুকি মূল্যের জ্বালানি পাবে না বিদেশি যানবাহন।

চুক্তির আওতায় প্রতিটি যানকে অপর দেশে চলাচলে রুট পারমিট নিতে হবে। নিয়মিত চলাচলকারী যানবাহনকে এক বছরের জন্য এ পারমিট দেয়া হবে। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিটি দেশ এ সংক্রান্ত তালিকা বিনিময় করবে। কোনো দেশ চাইলে প্রতি বছর এ তালিকা পরিবর্তন করতে পারবে। যে দেশের ওপর দিয়ে যানবাহন যাবে, সেই দেশের কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে তা সার্চ ও ইন্সপেকশন করতে পারবে। এছাড়া যে দেশে যে পণ্য নিষিদ্ধ, সে দেশের ভেতর দিয়ে সেসব পণ্য বহন করা যাবে না।

তিন বছর পর পর এই চুক্তি নবায়ন হবে। তবে কোনো দেশ চাইলে ৬ মাসের নোটিশ দিয়ে চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারবে। এছাড়া ভবিষ্যতে সার্কের অন্যান্য দেশ চাইলে এ চুক্তিতে যুক্ত হতে পারবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যাবে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিবিআইএন এমভিএ নামের এই চুক্তিটি রূপরেখা চুক্তি আঙ্ক্ষায়িত করা হয়েছে। এরপর কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে চলতি বছরের শেষের দিকে প্রোটকল চুক্তি হিসেবে আরেক চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে চার দেশের পথের সমীক্ষা, পরীক্ষামূলক চলাচল ও অভিবাসন-সুবিধা পর্যালোচনা করা হবে। এরপর আগামী বছরের শুরুতে চার দেশের মধ্যে যান চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চুক্তি অনুসারে যানবাহনের বৈধ মালিকানা, ফিটনেস ও ইন্স্যুরেন্সের হালনাগাদ দলিল থাকতে হবে। চালকের স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যে কোনো এক ধরনের লাইসেন্স থাকলেই চলবে। আর যাত্রীর থাকতে হবে বৈধ ভ্রমণ দলিল। প্রয়োজন হলে পথে যে কোনো দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যানবাহন পরিদর্শন করতে পারবে। নিষিদ্ধ কিংবা তালিকাভুক্ত স্পর্শকাতর মালামাল বহন করা যাবে না। ব্যক্তিগত, যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের অনুমতি পাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা ফরম পূরণ করতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত যানের দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন লাগবে। ব্যক্তিগত গাড়ির অনুমতি হবে সাময়িক এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে।

চলাচলের রুট:
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যান চলাচলের জন্য বিদ্যমান সব স্থলবন্দর দিয়েই বাংলাদেশ-ভারত যানবহন চলাচল করতে পারবে। তবে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে যাওয়া-আসার জন্য প্রাথমিকভাবে দু’টি করে চারটি পথ ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে নেপালে যেতে ঢাকা-বাংলাবান্ধা-জলপাইগুড়ি-কাকরভিটা এবং ঢাকা-বুড়িমারী-চেংরাবান্দা এ দু’টি পথ ব্যবহার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া ভুটানের পথ দু’টি হচ্ছে ঢাকা-বুড়িমারী-চেংরাবান্দা এবং অন্যটি ঢাকা-সিলেট-শিলং-গৌহাটি। সম্প্রতি ঢাকা-শিলং-গৌহাটি পথে যে বাস চালু করা হয়েছে সেটি দিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন ভুটানী ভ্রমণও করেছেন।

সূত্র জানায়, চুক্তিতে যাত্রীবাহী যানবাহন বলতে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বাস, ভাড়ায় চালিত বাস-কার ও ব্যক্তিগত গাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পণ্যবাহী যানের মধ্যে রয়েছে কনটেইনার বহন করা যায় এমন ট্রেইলর ও ট্রাক।

তবে ব্যক্তিগত গাড়ি অনিয়মিত যান হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে ৩০ দিন পর্যন্ত ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হবে। এই পথে যাতায়াতের জন্য পর্যটন, তীর্থযাত্রা, বিয়ের অনুষ্ঠান, চিকিৎসা, শিক্ষা সফর, রেলস্টেশনে যাওয়ার জন্য যাত্রার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ধরনের যাত্রীদের যাত্রাকালে জ্বালানি ভরে যেতে হবে। কোনো শুল্ক না দিয়েই নিতে পারবেন প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ। পথে জ্বালানির দরকার হলে ভর্তুকিবিহীন দামে জ্বালানি নিতে পারবেন। দুর্ঘটনায় পড়লে নিজ নিজ দেশের আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই গাড়ি নিয়ে যতোবার ভ্রমণ করবেন, ততোবার অনুমোদন নিতে হবে। খসড়া রূপরেখা চুক্তিতে বলা হয়েছে, উল্লিখিত চার দেশের বাইরে অন্যকোনো দেশ চাইলে এই অবাধ যান চলাচল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে।

তবে চার দেশের কেউ দ্বিমত করলে অন্তর্ভুক্তি আটকে যাবে। চুক্তিতে সই করা কোনো দেশ এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে অন্যদের লিখিতভাবে জানাতে হবে। এরপর চার দেশের পরিবহন সচিবরা ৩০ দিনের মধ্যে আলোচনায় বসে পরবর্তী করণীয় ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবেন। চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার লিখিত আবেদন বাকি তিন দেশের হাতে পৌঁছানোর দিন থেকে পরবর্তী ছয় মাস পর তা কার্যকর হবে।

এছাড়া যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনগুলো হবে সাদা রঙের। দুই পাশে হলুদ রঙ দিয়ে ইংরেজি এবং নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিবহনের নাম, দেশের নাম, যাত্রা শুরু ও শেষের স্থানের নাম এবং পথ লেখা থাকবে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান ছাড়াও মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কায় পণ্য রপ্তানি-আমদানিতে সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের বিধানও রাখা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

195 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ