সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৫ ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ইসলাম ও মানুষের সেবায় আল্লামা ফুলতলী (রহ.)


কুলাউড়া সংবাদ : বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫॥ পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এবং আজীবন দ্বীন, জাতি ও সমাজের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত আলিম, ফকিহ, মোহাদ্দিস, মোফাসসির, মোবাহিস, বাগ্মী-ওয়ায়েজ, উঁচুস্তরের আধ্যাত্মিক সাধক, বুজুর্গ, পবিত্র কোরআনের একনিষ্ঠ খাদেম, ইসলামী চিন্তাবিদ, গণমুখী রাজনীতিক, সমাজসংস্কারক, কল্যাণধর্মী অর্থনীতিবিদ, মানবমুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত বলিষ্ঠ কণ্ঠ, সুলেখক, জীবনঘনিষ্ঠ মানবতাবাদী মহান পুরুষ।
এ পৃথিবীতে কিছুসংখ্যক মানব সন্তানের আগমন হয়- যাঁরা একপর্যায়ে আসল নামের অন্তরালে ঢাকা পড়ে যান জনগণের সম্বোধনের চাদরে। আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (রহ.) ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি ‘ছাহেব কিবলাহ’ নামে খ্যাত ছিলেন। এ খেতাবে তাঁকে ভূষিত করেন তাঁরই ভক্ত-মুরিদান ও মুহিব্বিনরা। এ খেতাবে তিনি এতটাই বিখ্যাত হয়ে ওঠেন যে ‘ছাহেব কিবলাহ’ যেন তাঁর মূল নামে পরিণত হয়।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) ইলমে দ্বীনের খেদমতের পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবায় অবিস্মরণীয় ও ঈর্ষণীয় অবদান রেখে গেছেন। এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট, মানবসমাজের অগ্রগতি ও উন্নয়নের মধ্যেই একটি সমাজ ও দেশের উন্নতি ও কল্যাণ নিহিত। তাই সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত মানুষের সেবায় তিনি ছিলেন সর্বদা নিবেদিত। তাঁর সুদীর্ঘ ৯৫ বছরের অধিক সময় ব্যয় হয়েছে আর্তমানবতার সেবায়, অসহায়-এতিম, দারিদ্র্যপীড়িত লোকদের কল্যাণে।
ইসলামে ‘খিদমতে খালক’ তথা মানবসেবা হচ্ছে একটি এবাদত। মানবসেবা ব্যতীত মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। এ বাস্তব সত্যটি আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহ.) উপলব্ধি করতে পেরেই একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে নিজেকে সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন নিভৃতচারী জনদরদি ও বেমিসাল সমাজসেবক।
সাধারণ মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (রহ.) সব সময় নির্যাতিত মানুষের পাশে ছুটে গেছেন। সেবামূলক কাজে মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান তিনি বারবার করেছেন। পারিবারিক ও বংশগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবেশে আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহ.) নিজেকে একজন খাঁটি আলিম, জনহিতৈষী, সমাজসেবক, পরোপকারী, মানবদরদি ও কল্যাণকামী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বলতেন ‘আজ আমরা অধিকাংশ মুসলমান সমাজসেবার মহান দায়িত্ব বর্জন করিয়া চলিয়াছি। অথচ প্রকৃত মুসলমান হওয়ার জন্য প্রত্যেক মুমিনের আল্লাহওয়ালা সমাজকেন্দ্রিক হওয়া উচিত।’
এখানে আর্তমানবতার সেবায় আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহ.)-এর মূল্যবান অবদানের চিত্র তুলে ধরা হলো-

লতিফিয়া এতিমখানা প্রতিষ্ঠা
আল্লামা ফুলতলী (রহ.) সমাজের অনাথ, এতিমদের অসহায়ত্বের যন্ত্রণা অনুভব করে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছেন লতিফিয়া এতিমখানা নামের বিশাল প্রতিষ্ঠান। সেখানে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত প্রায় এক হাজার এতিম থাকা-খাওয়া ও সুশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করে লালিত-পালিত হয়ে সমাজের যোগ্য মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। তারা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ছে, তাদের এ সাহস, শক্তি ও প্রেরণার মূলে রয়েছে আল্লামা ফুলতলী (রহ.)-এর জীবনাদর্শ, মহৎ চিন্তা ও কর্মসাধনা। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত লতিফিয়া এতিমখানাটি বর্তমানে তাঁর সুযোগ্য বড় ছাহেবজাদা পরিচালনা করছেন। তিনি এতিমখানার জন্য তাঁর ভূ-সম্পত্তির আট একর জমি ওয়াকফ করে দেন।

গৃহনির্মাণ প্রকল্পের প্রবর্তন
অসহায় বিধবা ও এতিম গৃহহীনদের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে গৃহনির্মাণ প্রকল্পের প্রবর্তন করেছেন। তাঁর বড় ছাহেবজাদা আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরী নিজেই এতিম ও বিধবাদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে গৃহনির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি করে থাকেন, যা বর্তমান সমাজে একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত বটে।

বৃদ্ধানিবাস প্রকল্প প্রতিষ্ঠা
সমাজের দুস্থ ও অসহায় বৃদ্ধাদের সেবাশুশ্রূষার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বৃদ্ধানিবাস প্রকল্প’। এ প্রকল্পে অবহেলিত ও সম্বলহীন বৃদ্ধাদের আবাসন ও সেবাশুশ্রূষার আশ্রয়স্থল। তাঁর বড় ছেলে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরীর দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এ নিবাসটি সুন্দর ও সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

ফ্রি ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা
সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত, অসহায়, গরিব ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি নিজ বাড়িতে ফ্রি ডিসপেনসারি (চিকিৎসা কেন্দ্র) গড়ে তুলেছেন। সপ্তাহে দুই দিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে তাদের ফ্রি চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এ প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর বড় ছেলে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরী। তাঁর দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এ ফ্রি ডিসপেনসারিটি সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।

ফুলতলী লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা
যারা একবেলা একমুঠো ভাত না পেয়ে ক্ষুধার জ্বালায় আল্লাহর দরবারে আহাজারি করে, সমাজের ওসব ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় ও প্রতিবন্ধীর অন্ন সংস্থানে বিনা মূল্যে খাদ্য বিতরণের জন্য তিনি নিজ বাড়িতে ‘ফুলতলী লঙ্গরখানা’ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ফুলতলী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা
দ্বীনের খেদমতের একটি বৃহত্তর অংশ আনজাম দেওয়ার জন্য তিনি ফুলতলীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ফুলতলী ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত অসহায় বনি আদমকে সাহায্য-সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। দেশের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের সেবায় সবার আগে তিনি এগিয়ে আসতেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৮৮, ২০০০ ও ২০০৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গত ও দুস্থ মানুষের জন্য তিনি নিজ হাতে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। বিশেষভাবে ২০০৮ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সিডর-আক্রান্ত বিপন্ন মানুষের মধ্যে ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর ইন্তেকালের পূর্বলগ্নে তাঁরই নির্দেশে ব্যক্তিগত তহবিল ও মুসলিম হ্যান্ডস বাংলাদেশ এবং আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকে কর্তৃক পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রম সিডর এলাকার বিপন্ন মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। তাঁর নির্দেশে আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের অর্থায়নে সিডর-আক্রান্ত এলাকায় বিধ্বস্ত ৫২টি মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও ২৫০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মসজিদগুলোর নামকরণ করেছে ‘লতিফিয়া জামে মসজিদ’।
এ ছাড়া আল্লামা ফুলতলী (রহ.)-এর নির্দেশনা, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে গরিবদের মধ্যে উপার্জনের উপকরণ বিতরণ প্রকল্প, এতিম বৃত্তি প্রকল্প, বিধবা আবাসন প্রকল্প, গরিব অন্ধ আতুর সাহায্য প্রকল্প ইত্যাদি। উল্লেখ্য, আল্লামা ফুলতলী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর প্রতি শনিবার তাঁর ঈসালে সাওয়াব উপলক্ষে বিধবা ও নিঃস্ব ব্যক্তিদের খাবার বাবদ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়।

আর্তমানবতার সেবায় আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহ.) এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর আর্তমানবতার সেবার ভূয়সী প্রশংসা করে কবি বলেন, ‘বুঝ মানে না অবুঝ হৃদয় তুমি যে আর নাই রে নাই/অগো মানী ওয়ায়েস করনী হে যামানার হাতিমতাই’।

বহুমাত্রিক মানবসেবা তাঁকে কাল থেকে কালান্তরে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখবে নিঃসন্দেহে। অগণিত অসহায়, বঞ্চিত মানুষের জন্য তিনি ছিলেন ভরসা ও আশ্রয়স্থল। একটি বিশাল বটবৃক্ষের মতো তিনি আশ্রয়প্রার্থী অসংখ্য হতদরিদ্র লোকের ওপর কোমল ছায়া বিস্তার করে রেখেছিলেন। জাতির জন্য যাঁর গোটা জীবন এত আন্তরিক প্রচেষ্টা, তিনিই তো জাতির অভিভাবক। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) সারা জীবন জনগণ ও আর্তমানবতার কল্যাণে কাজ করে সত্যিকার অর্থেই জাতির অভিভাবক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
লেখক : গবেষক ও অধ্যক্ষ, হলিয়ার পাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুনি্নয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, সিলেট। লেখক কুষ্টিয়া ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ‘আল্লামা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) : জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক এমফিল ২০১৩ সালে সম্পন্ন করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

1010 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ