জানুয়ারি ২৩, ২০১৬ ২:৪০ পূর্বাহ্ণ

ফুটবলে মৌলভীবাজারের ছেলে জিদান মিয়ার চমক ?


ডেস্ক রিপোর্ট : ক্রিকেটের রক্তিম উত্তেজনায় যেখানে বাংলাদেশ সেখানে ফুটবল অনেকটা নিভু প্রায় ! তাই বলে কি স্বপ্ন দেখতে পারি না বাংলাদেশ ফুটবল নিয়ে ? বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে অনেকটা বেশি ভালবাসে।
চোখ ফেরা যাক কে এই জিদান মিয়া ?
জেনে নেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জিদান মিয়া। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই জিদান দেখিয়েছে তার ফুটবল প্রতিভার ঝলক। পেয়েছে এশিয়ান ফুটবল অ্যাওয়ার্ডস আসরে বিশেষ স্বীকৃতি। তিন বছর ধরে খেলছে যুক্তরাষ্ট্রের এফসি ডালাস অনূর্ধ্ব-১৫ দলে।
এশিয়ান ফুটবল অ্যাওয়ার্ডস আসরে জিদান মিয়া। জিদানের সাত বছর বয়সেই স্বপ্নের তাড়া শুরু। বয়স এখন ১৪। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে নাম লেখানোর স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে চলছে ক্লান্তিহীন খাটুনি। ভাবছেন, বিশ্বকাপ মাতানো ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার জিনেদিন জিদানের ছোটবেলার গল্প বলছি? না, বলছি জিদান মিয়ার কথা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের এই কিশোর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন একাডেমিভিত্তিক টুর্নামেন্টে খেলার পর গত তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের এফসি ডালাস অনূর্ধ ১৫ দলে খেলছে। সেই সঙ্গে চলছে বিশ্বের অন্যতম নামী অ্যাথলেটিকস প্রশিক্ষণকেন্দ্র মাইকেল জনসন পারফরম্যান্স সেন্টারে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার কাজ।
বেশ কয়েক মাস আগেই জিদানের খবর কানে আসে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তার সাক্ষাৎ পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে গত নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এশিয়ান ফুটবল অ্যাওয়ার্ডস আসরে অংশ নিতে লন্ডনে আসে জিদান। ওই অনুষ্ঠানে ফুটবলের উদীয়মান তারকা হিসেবে জিদানের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘স্পেশাল রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ডস’। এই সুযোগে জিদানের কাছ থেকে জানা হয়, তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ও পেছনের গল্প।
লন্ডনের নিকটবর্তী শহর কেন্টের বাসিন্দা সুফিয়ান মিয়া ও শিপা মিয়া। তাদের একমাত্র ছেলে জিদান মিয়ার জন্মও এখানেই। এই পরিবারের বাংলাদেশের বাড়ি মৌলভীবাজার উপজেলার রাজনগরে। সুফিয়ান মিয়া লন্ডনে পাড়ি জমান সেই সত্তরের দশকে।
সুফিয়ান মিয়া বেশ ফুটবল পাগল মানুষ। তরুণ বয়সে তিনি নিজেই নামি ফুটবলার হওয়ার জন্য নানা চেষ্টা চালিয়েছেন। সর্বশেষ ২০০৯ সালে মিডলসেক্স দলের হয়ে তিনি কাউন্টি লিগেও খেলেছিলেন।
সুফিয়ান মিয়া বলেন, ‘খুব ছোটবেলা থেকেই জিদানকে সঙ্গে নিয়ে ফুটবল প্রশিক্ষণে যেতাম। ওর বয়স যখন প্রায় সাত বছর, মাঠে বল নিয়ে তার দুরন্তপনা সবার দৃষ্টি কাড়ে’। খুব কম বয়সেই ছেলের ফুটবল প্রতিভা আর খেলার প্রতি টান আঁচ করতে পেরে তিনি জিদানকে ডেভিড বেকহাম সকার একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। শুরু হয় জিদানের ফুটবলার হয়ে ওঠার অভিযান।
বাবা যখন সন্তানের মাঝে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের জাগরণ দেখতে পান, তখন সন্তানের প্রতিভার ধার যে কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। জিদানেরও ঠিক হয়েছে তা-ই। শুরু থেকেই সে একাডেমি পর্যায়ের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পায়। সে একে একে ইংল্যান্ডের ডালউইচ হ্যামলেটস এফসি, ক্রিসটাল প্যালেস এফসি, প্রোটাস সকার একাডেমি, এলিট সকার একাডেমির হয়ে মাঠে নামে। ১১ বছর বয়সে সুযোগ পায় আর্সেনাল এফসি ডেভেলপমেন্ট স্কোয়াডে। একাডেমি পর্যায়ের টুর্নামেন্টে খেলার পাশাপাশি বাবার আগ্রহে ডেনমার্ক, স্পেন, হংকং, থাইল্যান্ডে গিয়ে বিভিন্ন একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে জিদান।
জিদান জানায়, সর্বশেষ ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাবা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের জেনিভার স্পাইয়ার ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে জিদান বিশ্বখ্যাত অ্যাথলেটিকস প্রশিক্ষণকেন্দ্র মাইকেল জনসন পারফরম্যান্স সেন্টারের (এমজেপিসি) কর্তাদের নজর কাড়ে। তাঁরা জিদানকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য বৃত্তি প্রদান করেন। প্রায় দেড় বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে সে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় কলাম্বাস ক্রু ক্লাবের হয়ে খেলত। ফুটবলে আরও ভালো সুযোগের কথা বিবেচনা করে ২০১৪ সালের আগস্টে সে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসের মাইকেল জনসন পারফরম্যান্স সেন্টারে (এমজেপিসি) বদলি হয়। এখানে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জিদান খেলছে এফসি ডালাস অনূর্ধ্ব ১৫ দলে। ইতিমধ্যে সে ডালাস টেক্সাস ক্লাসিক লিগ, দ্য ডালাস মেমোরিয়াল টুর্নামেন্ট ও টেক্সাস ব্লু কাপ টুর্নামেন্টে নিয়মিত খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। জিদান বলছিল, ‘সেন্টার মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেই আমি বেশি পছন্দ করি। কিন্তু মাঝেমধ্যে লেফট উইং ও স্ট্রাইকার হিসেবেও খেলতে হয়। যে পজিশনেই খেলি না কেন, মাঠে নিজেকে উজাড় করে দিতে মোটেও কার্পণ্য করি না।’
ভালো ফুটবলার হয়ে উঠার অনুষঙ্গগুলো ছোটবেলা থেকেই জিদানের মধ্যে দৃশ্যমান ছিল। বল পায়ে তেজি ভঙ্গি আর দারুণ গতি জিদানকে এগিয়ে দিয়েছে বারবার। দৈহিক ক্ষিপ্রতা, শৃঙ্খলা আর ফুটবলার হয়ে উঠার প্রবল ইচ্ছাশক্তির কারণেই এফসি ডালাস নিজেদের দলে টেনে নেয় জুনিয়র এই ফুটবলারকে। মাঠেও নিয়মিত নিজের ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ দিচ্ছে জিদান। গত বছর ডালাস কাপ টুর্নামেন্টে ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হয় জিদান। পুরো টুর্নামেন্টে জিদান গোল করেছিল মাত্র দুটি। কিন্তু জিদান আলোচিত হয় অন্য কারণে। কোয়ার্টার ফাইনালে একদম শেষ মুহূর্তে মোক্ষম গোলটি জিদানই করে। সেমিফাইনালে এফসি ডালাস প্রতিপক্ষের জালে চারটি গোল জড়ায়। যার সবগুলো জিদানের বানিয়ে দেওয়া। উদীয়মান এই ফুটবলার ডালাস ক্লাসিক্যাল জুনিয়র লীগে নিজের অবস্থান পোক্ত করে নিয়েছে।
পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের পিছে ছুটলেও জিদানের পড়াশোনায় কিন্তু কোনো ছাড় নেই। সে ডালাসের একটি বিশেষায়িত স্কুলে ইয়ার টেনে পড়ছে। জিদান জানায়, ওই স্কুলের প্রায় সবারই পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলার, বাস্কেটবল খেলোয়াড়, অভিনয়শিল্পী কিংবা অন্য কিছু হওয়ার বিশেষ স্বপ্ন আছে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে স্কুল। প্রতি ছয় সপ্তাহ পরপর পরীক্ষা। ৮০ শতাংশের ওপরে নম্বর পেলেই কেবল পাস মেলে। জিদান জানায়, স্কুল শেষ করে সপ্তাহে পাঁচ দিন টানা তিন ঘণ্টা করে শারীরিক গঠনের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এর মধ্যে সপ্তাহে তিন দিন থাকে এএফসি ডালাস অনূর্ধ্ব ১৫ দলের সঙ্গে প্রশিক্ষণ। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বেশির ভাগই খেলতে হয় ফুটবল ম্যাচ।
জিদান জানায়, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন তাড়া করতে গিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হয়েছে তার। তবে তার কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য বিষয় মনে হয়েছে গত নভেম্বরে মাইকেল জনসন পারফরম্যান্স সেন্টার নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র ‘চেইজিং পারফেকশন’-এ অংশগ্রহণ।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিত্সা, প্রযুক্তি ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা ইতিমধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। কিন্তু পুরো পশ্চিমা বিশ্ব যে ফুটবল নিয়ে পাগল, সেই ফুটবল অঙ্গনে বাংলাদেশিদের অর্জনের খাতাটি বলতে গেলে শূন্য। পশ্চিমা পেশাদার ফুটবলে নাম লিখিয়ে জিদান কি পারবে নতুন ইতিহাস গড়তে?

নিউজটি শেয়ার করুন

303 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ