সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৫ ২:০৮ পূর্বাহ্ণ

সন্তানরা বিপথগামী:অভিভাবকদের সচেতনতা কতটুকু


শরীফ আহমেদ :: তথ্য প্রযুক্তির ক্রমবিকাশে পৃথিবী যত এগিয়ে যাচ্ছে তত উন্নত আধুনিক হচ্ছে আমাদের জীবনযাত্রা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। কিন্তু আমরা মানসিকভাবে কতটা পরিবর্তিত হয়েছি! আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু পাল্টাতে পেরেছি! সেটা একটা গবেষণার বিষয় বটে। আমরা হাতে পেয়েছি তথ্য প্রযুক্তির উন্নত সব সরঞ্জাম। ইচ্ছে করলে টাকা থাকলে সুবিধা ভোগ করতে পারি এসবের এবং সুবিধাভোগী মানুষগুলো তা করছেনও। আমার আগের একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম তথ্য প্রযুক্তির ক্রমান্বয়ে ঘটা আধুনিকতার পাশাপাশি আমাদের (অভিভাবক ও সন্তানসহ সবার) সামাজিক জীবনাচরণে এর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও সহজলভ্যতার কারণে যেমন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে তেমনি তাদের চোখে পশ্চিমা সংস্কৃতির নিষিদ্ধ জগতের দরোজাও খুলে যাচ্ছে সপাট। ফলে অপরিপক্ক মানসিকতা, ভালো বা মন্দের মধ্যে ভালোটি বেছে নেবার অক্ষমতা আর ব্যক্তি জীবনকে ওই মন্দের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে না পারার কারণে শৈশব বা কৈশোরে থাকতেই জন্ম নিচ্ছে আশেপাশে থাকা মানুষগুলোর প্রতি অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব। বলা বাহুল্য শৈশবে থাকা যে কোন ছেলে বা মেয়ের শুরুটা যেহেতু হয় পরিবারের সাথেই তাই ওই অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্বের দোলাচলটাও শুরু হয় পরিবারের সদস্যদের সাথে। আমি কখনোই বলছি না সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে অবাধ প্রযুক্তির এ প্রবাহ বন্ধ করা বা নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। বরং আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো যে গতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা হয় তা আর বেশি গতিশীল করতে হবে। এর পরিসেবা মূল্যেও অনভিপ্রেত মূল্য সংযোজন কর (মূসক) হ্রাস করতে হবে শুধু তাই নয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তবে অবশ্যই তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি থেকে দেশের অভ্যন্তরে থাকা সার্ভারগুলোতে বিশেষ ফিল্টারিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। যেন কেউ চাইলেই সানি লিয়ন, টেরা প্যাট্রিক বা কেটি ব্যাংক্সের মত পর্ণোতারকাদের নীল জগতে যেতে না পারে। এ তো গেল অবাধ প্রযুক্তির কু-প্রভাবে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সইতে না পারা সন্তানদের চিত্র এবার আসা যাক সেই সব সন্তানদের পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের প্রসঙ্গে। মধ্যবিত্ত সমাজে সন্তানদের অবক্ষয়রোধে শুধু যে প্রযুক্তির আবহকে দোষারোপ করার অবকাশ আছে এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় ৯০ দশকের শুরুতে স্ত্রীকে হত্যা করে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল ডাঃ মনিরকে। যার বাবা-মাও ছিলেন ডাক্তার। তখন ইন্টারনেট কি সেটাই অনেকে জানতেন না। ডাঃ মনিরের পরকীয়াজনিত সম্পর্কের কারণে বলি হতে হয়েছিল তার নববিবাহিতা স্ত্রী সীমাকে। ওই ঘটনার প্রায় দুই দশক পরও এখনো চলছে দাম্পত্য কলহ, নির্যাতন, বিচ্ছেদ এমনকি খুনও। তা হলে দায়টা কার? সমাজের নাকি অভিভাবকের নাকি প্রায়শ ক্ষেত্রে যার মতামতকে গ্রাহ্য না করেই বসিয়ে দেয়া হয় বিয়ের পিঁড়িতে সেই হতভাগ্য কন্যার?
* যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা দ্যা অপটিমিস্টের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক আমার শিক্ষক প্রফেসর ড. আব্দুল মতিন মনে করেন এ ধরণের বিপত্তি এড়াতে হয় প্রথম থেকেই। অভিভাবকদের সন্তানদের বিষয়ে সচেতন হবার মধ্য দিয়ে। নয়তো সন্তানদের তীব্র আকাক্সক্ষার স্বার্থে তাদের সন্তানের পছন্দ করা সঙ্গীকেই মেনে নিতে হবে। আর এমনটা মানতে অনেক অভিভাবকরা যখন রাজী হন না তখন জোর করে বিয়ে দেবার পর তৈরি হয় দাম্পত্য কলহসহ বিভিন্ন জটিলতা। এমন কি অনেক সময় তাদের বিবাহিত সন্তান পূর্বের প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে সম্পর্ক বহাল রেখে চলে। যা সামাজিক অবক্ষয় তৈরি করে। আমাদের সমাজে তাই লেখাপড়ায় অমনযোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরীক্ষায় অকৃতকার্য, মাদকাসক্তি, অবাধে যৌনাচারসহ বিবাহের পর বিবাহ বিচ্ছেদ, আত্মহত্যা ও খুনের মত ঘটনা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তিনি জানান।
*প্রায়শই বলা হয় সন্তানরা তাদের অভিভাবকের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে পারে না। কিন্তু কখনো এটি বলতে শুনিনা যে অভিভাবকদেরও উচিৎ তাদের প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো। বিশেষ করে সেটি যদি হয়ে থাকে একান্তই তাদের ভবিষ্যতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত তা হলে ঐ সিদ্ধান্ত অবশ্যই সন্তানের মতামতের উপর ভিত্তি করেই নেয়া উচিৎ। উদাহরণ হিসেবে এখানে বাস্তব একটি ঘটনা জানাতে চাই। কুলাউড়ার বিশিষ্ট একজন ব্যবসায়ীর একমাত্র কন্যা মনিরা (ছদ্মনাম) সিলেটের একটি কলেজে পড়ে। এসএসসি পরীক্ষা দেবার আগেই সে কুলাউড়ারই একজন তরুণ শিমুল (ছদ্মনাম)’র সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। শিমুল আত্মীয়তার সূত্রে তার আপন খালাতো ভাই। এক পর্যায়ের তাদের প্রেম নিবিড় হৃদ্যতা থেকে শারীরিক উন্মাদনা পর্যন্তও গড়ায়। শিমুল ও মনিরার পরিকল্পণা ছিল মনিরার ¯œাতক সম্পন্ন হলে সে মনিরার অভিভাবকের কাছে বিয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাবে। কিন্তু বিপত্তিটা দেখা দিলো যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী পাত্রের জন্য সুন্দরী কন্যা মনিরার বিয়ের প্রস্তাব আসলো তখন। পাত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জেনে মনিরার ব্যবসায়ী পিতা প্রচুর মুনাফার আভাস পেলেন এবং মেয়ের লেখাপড়ার পাঠ শিকেয় তুলে কন্যাদায়গ্রস্ত অপারগ পিতার মতই মেয়েকে বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মনিরার পক্ষে শিমুলের কথা জানানো সম্ভব না হলেও পরবর্তীতে সে মাকে শিমুলের কথা জানাতে বাধ্য হয়। কিন্তু মনিরার মা মেয়েকে ভয় দেখান এই বলে যে মনিরা যদি বিয়েতে মত না দেয় তা হলে মনিরার বাবা স্ট্রোক করে মারা যাবেন। যদিও শিমুল দেশে আসা প্রবাসী পাত্রের সাথে দেখা করে সব কিছু খুলে বলায় বিয়ের প্রক্রিয়া থেমে যায় কিন্তু শিমুল ও মনিরার বক্তব্য হচ্ছে; এভাবে আর কতদিন তারা এধরণের পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে? প্রসঙ্গত মনিরার সাথে শিমুলের যুক্তরাজ্য প্রবাসী ফুপাতো ভাই সাক্ষাৎ করলে মনিরাও তাঁকে শিমুলের সাথে তার অসংখ্য দিন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা জানায়। এসময় মনিরা আরও বলে, শিমুলের সাথে বিয়ে না দিয়ে অন্যত্র বিয়ে দিলে সেও আত্মহত্যা করবে। এসময় শিমুলের ভাই মনিরাকে এই তথ্যটি ঘরোয়া বৈঠকে জানানোর কথা বললে মনিরা উত্তর দেয়, আমার মা আমাকে বলেছেন শিমুলের সাথে আমার কোন সম্পর্ক আছে এটা স্বীকার করলে আমার বাবা আত্মহত্যা করবেন। মনিরার বক্তব্য জেনে শিমুলের ফুপাতো ভাই মনিরার বাবাকে শিমুলকে মেনে নেয়ার আহ্বান জানালে তিনি বলেন, আমার মেয়ে আজ যদি লন্ডন বা আমেরিকা যেতে পারে তা হলে ভবিষ্যতে আমার ছেলেরাও সেখানে যেতে পারবে। তুমি আমার ব্যাপারে কথা বলতে এসো না। এসময় অপমাণিত হয়ে শিমুলের ওই ফুপাতো ভাই মনিরার বাসা থেকে বেরিয়ে আসলেও মনিরার বাবার সাথে শিমুলের অভিভাবক ও অন্যান্য ঘণিষ্ট আত্মীয়স্বজনরা ঠিকই দফায় দফায় বৈঠকে বসেন সমঝোতার জন্য। কিন্তু অদ্যাবধি মনিরার বাবা কোন সমাধানে যেতে রাজী হন নি। তবে এখানে যে বিষয়টি বিবেচনার দাবী রাখে তা হলো, তিনি যে কোন জায়গায় তাঁর মেয়েকে বিয়ে ঠিক করতে পারবেন কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর মেয়ে যদি বিয়ের দিন বেঁকে বসে কিংবা বিয়ের পর স্বামীকে সবকিছু খুলে বলে চলে আসে অথবা আবেগের বশে কোন অঘটন ঘটিয়ে বসে তখন এর দায়ভার কার উপর বর্তাবে?

নিউজটি শেয়ার করুন

313 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ