মার্চ ১০, ২০১৬ ১১:০৯ অপরাহ্ণ

সিলেট সার্কিট হাউজে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতো অহরহ


দীর্ঘদিন পর সিলেট সার্কিট হাউজের ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর খামখেয়ালিপনার জন্য নানা ধরণের অবৈধ ব্যবসায় ভরপুর ছিলো সিলেট সার্কিট হাউজ। রাষ্ট্রীয় অতিথিদের পাশাপাশি প্রতি মাসে এখানে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অপ্যায়ন করা হতো বহিরাগতদের। শুধু তাই নয় সিলেট সার্কিট হাউসে বহিরাগতদের আনাগোনা, আড্ডা, অবৈধ মেস, অব্যবস্থাপনা-এমনকি স্পর্শকাতর এই স্থানে ফেনসিডিলসহ নেশাদ্রব্য ব্যবসার অভিযোগও পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

এমন অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার আগেই নড়েচড়ে বসেছেন সার্কিট হাউসের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে হর্তাকর্তারা। শুধু তাই নয়- ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলামের স্ত্রীর সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে সিলেট সার্কিট হাউস থেকে ফেন্সিডিলের চালান অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সময় র‌্যাব-৯ এর একটি দল ওই দিন রাত ৮টার দিকে সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ এলাকার শাকিল কমিউনিটি সেন্টারের সামন থেকে গাড়িসহ চালককে গ্রেফতার করে। এরপরেও থেমে যায়নি  সিলেট সার্কিট হাউজকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা। বরং দিনে দিনে আরো জমজমাট হয়ে ওঠে।

সার্কিট হাউসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজ সকালে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কাছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করা হবে জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন বলেন- তদন্ত কমিটি তদন্ত করে কি পেয়েছে তা আগামীকাল বৃহস্পতিবার (আজ) বিস্তারিত জানা যাবে।

সূত্রে জানা যায়- সিলেট সার্কিট হাউসে দীর্ঘদিন থেকে বাবুর্চি মতিন মিয়ার সহযোগী বাবুর্চি হারুন মিয়া একটি মেসই খুলে বসেছেন! এখানে নিয়মিত ২০ জন লোকের রান্না করা হতো। প্রশ্ন ওঠেছে- এরা কারা, সম্মানিত অতিথির বাইরে কেউ থাকলে তার ওপর নজরদারি কি আছে? ভিআইপি অতিথি ছাড়া, মূল বাবুর্চির বাইরে এই মেস ঘিরে নিয়মিত রান্নাবান্না ও পার্টি দেয়া হত।

সিলেট সার্কিট হাউসের মূল বাবুর্চি মতিন মিয়া। কিন্তু তিনি ভিআইপি অতিথি এলেই রান্নার নির্দেশ পান। নিয়ম হচ্ছে- যে সংস্থা বা বিভাগের অতিথি আসবেন, সেই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা কাঁচাবাজার করে দেবেন। বাবুর্চি মতিন শুধু রান্না করে দেবেন। মতিন মিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সে দায়িত্বই পালন করে আসছেন। কিন্তু তার বাইরেও একজন অঘোষিত বাবুর্চি আছেন।

তিনি হারুন মিয়া। মতিন মিয়ার সহকারী। সার্কিট হাউসের ভিভিআইপি ভবনের পাশেই কর্মকর্তা ভবন। সেই ভবনের নিচের রান্নাঘরে নিয়মিত ২০ জনের রান্না করতেন এই হারুন মিয়া। এদের মধ্যে হয়তো ৭-৮ জন কর্মকর্তা, বাকিরা কারা এই প্রশ্ন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।

সার্কিট হাউসের কর্মকর্তা ভবনের ৩য় তলার রুমগুলোয় প্রায়ই হারুনের রান্না করা খাবারে নিয়মিত পার্টি হয়ে থাকে। জন্মদিন, কমকর্তাদের স্বজন, বন্ধুবান্ধব মিলে পার্টি হয়। এসব পার্টিতে অনেক সময়ই বাইরের লোক সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেন। যেদিন প্রধান বিচারপতি সিলেটে এসেছিলেন, সেদিনই আগের রাতেই কর্মকর্তা ভবনের ওই রান্নাঘরে ১০০ জনের রান্না করেছেন মতিন মিয়া। কাঁচাবাজার করে দেয়া হয়েছিল সিলেট জজ কোর্টের পক্ষ থেকে।

সার্কিট হাউসের প্রধান বাবুর্চি মতিন মিয়া বলেন- কেবল ভিভিআইপি গেস্ট এলেই আমি রান্না করি। এসময় আমাকে হেল্প করে হারুন মিয়া। আমি বেতনভুক্ত, সে কোনো বেতন পায় না।

সূত্রে আরো জানা যায়- সিলেট সার্কিট হাউসের ভিভিআইপি কক্ষে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে এখন বেরিয়ে আসছে ‘থলের বিড়াল’। এমনকি আদালতের অনুমতি না নিয়ে সার্কিট হাউসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জিডি করায় উচ্চ আদালত তলব করেছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের।

ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরুর পর রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা সার্কিট হাউসকে ঘিরে নানা রহস্য উদঘাটিত হচ্ছে। বেরিয়ে আসছে অরক্ষিত সার্কিট হাউসের অব্যবস্থাপনার নানা দিক। শুধু তাই নয়- আগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর গত সোমবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সার্কিট হাউসে খুলে বসা হারুন বাবুর্চির অবৈধ হোটেল ও মেস। একই সঙ্গে হারুন বাবুর্চিকেও সার্কিট হাউস থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার দিন ১০০ জনের খাবার খাওয়ার বিষয়টিও নজরদারি করা হচ্ছে। কারা ওই দিন সার্কিট হাউসে এসেছিলেন, সে ব্যাপারেও খোঁজ নেয়া হচ্ছে।

এদিকে, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও খতিয়ে দেখছে অব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো। এমনকি ঘটনা তদন্তে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত খোদ তদন্ত কমিটির অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তারা। সার্কিট হাউসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের জেনারেল রেজিস্ট্রার সৈয়দ মো. আমিনুল ইসলামের পক্ষে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মো. আজিজুল হক স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে অগ্নিকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সাইফুজ্জামান হিরোকে এ ঘটনার তদন্তভার দেয়া হয়।

এদিকে, ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলামের গাড়ি থেকে ৩শ’৭৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ জেলা প্রশাসকের গাড়ি চালক রুমন মিয়াকে (২৭) গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৯ এর একটি বিশেষ দল। গ্রেফতারকৃত রুমন, ফেন্সিডিলের চালান ও জেলা প্রশাসকের স্ত্রীর ব্যবহৃত গাড়িসহ ওই দিন রাতে সিলেট র‌্যাব-৯ এর সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৯ জানায়- সিলেটের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলামের স্ত্রীর ব্যবহৃত গাড়ি (সিলেট ঘ-১১-০২৫৭) নিয়ে সার্কিট হাউস থেকে ফেন্সিডিলের চালান গাড়ি করে অর্ডার অনুযায়ী সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ শাকিল কমিউনিটি সেন্টারের পার্শ্ববর্তী একটি ওয়ার্কশপে দেয়ার কথা রয়েছে, এমন গোপন সংবাদেও ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ফেন্সিডিলের চালানসহ চালক রুমন মিয়াকে গ্রেফতার করে।

দীর্ঘদিন থেকে গ্রেফতারকৃত রুমন মিয়া সিলেটে জেলা প্রশাসনের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা করে আসছে। এমনকি ওই সময় সে র‌্যাবকে জানায়- ফেন্সিডিলের চালান সিলেট সার্কিট হাউসের একটি ঝোঁপের মধ্যে ছিলো।

নিউজটি শেয়ার করুন

448 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ