মার্চ ২৮, ২০১৬ ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

সিলেটে হিন্দু বাড়িতে হামলা “মালাউন জ্বালাইলাও বলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়


নিজস্ব প্রতিবেদক: ”এশার নামাজের পরে স্থানীয় মসজিদসহ পার্শ্ববর্তী ৩/৪ টি মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা করা হয় ‘যত মুসলমান ভাইরা আছ এক হও, মালাউন আজকে জ্বালাই লাইতাম’। মাইকের এই ঘোষণা শোনে কয়েকশো গ্রামবাসী আমাদের বাড়িতে দা, কোদাল সহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হন। ‘মালাউন জ্বালাইলাও’ বলতে বলতে তারা বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।”

এমনটি অভিযোগ করেন লিপন চন্দ্র দেবের স্ত্রী সঞ্জু রানী দেব। শনিবার রাতে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণের বারকোট গ্রামে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মসজিদে ঘোষণা দিয়ে লিপন দেবের বাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে স্থানীয় এলাকাবাসী। এসময় হামলার শিকার হন সঞ্জু রানী দেব ও তার ছেলে আপন দেব (৫)।

তবে হামলাকারীদের অভিযোগ, শনিবার বিকেলে লিপন দেব মসজিদের ভেতরে গিয়ে একজনকে মারধর করেন ও মসজিদের দিকে ঢিল ছুঁড়তে থাকেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকাবাসী তার বাড়িতে হামলা চালায়।

শনিবার রাতের এ ঘটনায় রবিবার গোলাপগঞ্জ থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের হলেও রোববার রাত ১২টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মকদিল আলী  বলেন, সন্ধ্যার পর মসজিদের মাইকে এলাকার সবাইকে জড়ো হতে বলা হয়। এতে আড়াই থেকে তিনশ’ লোক জড়ো হন। আমিও যাই। গিয়ে শুনি লিপন দেব মসজিদে ঢিল ছুঁড়েছে ও নামাজ পড়তে আসা এক ব্যক্তিকে মারতে চেয়েছে। এসময় আমি বিষয়টি থানা পুলিশকে জানাতে বলি। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আমি সাথেসাথেই গোলাপগঞ্জ থানার ওসিকে ফোনে বিষয়টি জানাই। তবে পুলিশ আসার আগেই লিপনের বাড়িতে ভাংচুর করে উত্তেজিত জনতা।

মসজিদে ঢিল ছোড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে লিপন চন্দ্র দেবের স্ত্রী সঞ্জু রানী দেব বলেন, স্থানীয় আকবর আলীর সাথে আমাদের জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। শনিবার বিকেলে এই বিরোধকে কেন্দ্র করে আকবর আলী ও আমার স্বামীর মধ্যে ঢিল ছোঁড়াছুড়ি হয়। উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা এসময়ে উভয় পক্ষকে নিবৃত করলে যে যার ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে এই ঢিল ছুড়াকে পার্শ্ববর্তী মসজিদের দিকে ঢিল ছুড়া হয়েছে বলে এলাকায় প্রচার করে আকবরের সঙ্গীরা।

রোববার দুপুরে সরেজমিনে বারকোট গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে আলাপ করেও জানা গেছে, আকবর আলী ও লিপন দেবের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এ ঘটনার সূত্রপাত। জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা চলছে বলেও জানা যায়।

শনিবারের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিপন দেবের বিরোধী পক্ষ অটোরিকশা চালক আকবর আলী  বলেন, বিকেলে আমি নামাজ পড়তে মসজিদে এসেছিলাম। এসময় লিপন মসজিদের ভেতরেই দা নিয়ে আমাকে মারতে আসে। এসময় আরো দু’জন মুসল্লি এগিয়ে এসে আমাকে রক্ষা করেন। লিপনের সাথে ধস্তাধস্তিতে তারাও আহত হন।

আকবর আলী বলেন, লিপন আমাকে মারতে না পেরে মসজিদে ঢিল ছুড়তে থাকে। এতে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে রাতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে জড়ো করেন। এসময় আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে কিছু উত্তেজিত জনতা লিপনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।

তবে এসময় অগ্নিসংযোগের কোনো ঘটনা ঘটেনি দাবি করে আকবর আলী বলেন, লিপন এবং তাঁর স্ত্রীই কাঠখড় জড়ো করে নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে লিপন দেব বলেন, গত বৃহস্পতিবার আকবর আলী আমার উপর হামলা চালায়। শনিবার বিকেলে পুনরায় সে আমার উপর ঢিল ছুঁড়ে। এসময় আমিও তাঁর উপর ঢিল ছুঁড়ি। এ-ঘটনাকে মসজিদে ঢিল ছুঁড়েছি বলে প্রচার করে আকবর আলী ও তাঁর লোকজন।

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শনিবার রাতের ঘটনার পর থেকেই এলাকার আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। বর্তমানে একজন এসআইর নেতৃত্বে ৩ জন পুলিশ লিপনের বাড়ির নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন।

জানা যায়, আকবর আলী ও লিপন দেবের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। তার জমি আকবর আলী দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ লিপন দেবের। এই অভিযোগে মামলাও করেছেন তিনি।

জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ১২ /১৩ বছর আগে লিপন চন্দ্র দেবের ভাই লালন চন্দ্র দেব খুন হন বলেও জানা গেছে।

তবে জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে আকবর আলী বলেন, আমি নিজের জমিতেই থাকি। জমির সকল বৈধ কাগজপত্র আমার কাছে আছে।

এ ব্যাপারে গোলাপগঞ্জ থানার ওসি ফজলুল হক শিবলি বলেন, ঘটনার খবর শুনেই আমি ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ব্যাপারে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান  বলেন, পুলিশ আসামিদের ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সহায়তায়।

এদিকে, এ ঘটনার খবর শুনে রোববার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ ও পূজা উদযাপন পরিষদের সিলেট জেলা ও মহানগর কমিটির নেতারা।

নিউজটি শেয়ার করুন

456 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ