জানুয়ারি ৩০, ২০১৬ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

শেকড়ের মত হাত-পা – বিরল রোগী বাংলাদেশে


 

হাত পায়ের আঙ্গুলের ডগায় নখ গজাবে সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু সেই নখ যদি হয় গাছের শেকড়ের মতো? তাহলে? হ্যাঁ, ভয়ংকর হলেও সত্য, তেমনটিই ঘটেছে খুলনার এক ভ্যান চালকের জীবনে।

গত ১০ বছর ধরে তার হাত পায়ে গজাচ্ছে এক ধরনের শেকড়। বিরল এ রোগটি নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আজ (শনিবার) সকালে তিনি ভর্তি হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

২৫ বছর বয়সী যুবক আবুল বাজনদারকে দেখেই মনে হতে পারে দুই হাতে তিনি কিছু গাছের শেকড় ধরে আছেন। কিন্তু না, বিরল এক রোগে তার দুই হাতের তালুর চামড়া এবং ১০টি আঙুল প্রসারিত হয়ে অনেকটাই গাছের শেকড়ের মতো আকার নিয়েছে। পায়ের আঙুল আর তালুতেও একই অবস্থা। হাত ও পায়ের নখগুলো হারিয়ে গেছে সেই শিকড়ের ভেতর।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে খুলনার পাইকগাছার আবুল বাজনদারের ছবি ছড়িয়ে পড়লে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিট প্রধান অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন।

খুলনার পাইকগাছা পৌর সদরের ৫নং ওয়ার্ড সরল গ্রামের বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছোট্ট কুঁড়েঘরে বাবা ও মায়ের সাথে বসবাস করেন আবুল। আবুলের বাবা মানিক বাজনদার জানান, ২০০৫ সাল, আবুলের বয়স তখন ১৫ বছর। ওই বছর বৃষ্টির সময় চারদিকে পানিতে সয়লাব। বাড়ির উঠানেও জলাবদ্ধতা। এভাবে পানির মধ্যে কয়েক দিন ভ্যান চালানোর এক পর্যায়ে আবুলের হাতে পায়ে আঁচিলের মত রোগ দেখা দেয়। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এখন সেটি ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। এই রোগের কারণে দুই হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে পারে না সে। ভাত খাওয়া, পোশাক পরিধানসহ প্রাকৃতিক ডাকের সকল কাজই তাকে অন্যের সাহায্য নিতে হয়।

sekor_18643

চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে গত ১০ বছরে দরিদ্র পরিবারটি নিঃস্ব হয়েছে অনেক আগেই। প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় আবুলকে। সেখানকার চিকিৎসকেরা একপর্যায়ে তাঁকে আরও উন্নত চিকিৎসা নিতে বলেন। অভাবের সংসারে দ্বারে দ্বারে ঘুরে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে টাকা তুলে দুই দফায় ভারতের কলকাতায় চিকিৎসাও করানো হয়েছে আবুলের।

আবুলের মা আমেনা বেগমের চাওয়া সুস্থ হয়ে বেঁচে থাক তার ছেলে। তিনি জানান, ওঝা-বৈদ্য, ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েও কোনো কাজ হয়নি। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটানোর সামর্থ্য নাই তাদের। তারপরও বিভিন্ন মানুষের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে ছেলের চিকিৎসা করালেও কোনো উন্নতি হয়নি বরং ধীরে ধরে গাছের শিকড়ের মত হাত–পায়ের শিকড় হয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। হঠাৎ কেউ দেখলে ভয় পেয়ে যায়। তার ছেলেকে দেখলে অন্য ছেলে মেয়েরা দূরে সরে যায়। তিনি আরো জানান, আমার ছেলে বলে, মা আমাকে একটু বিষ খাইয়ে শান্তি দাও, আমি আর পারছি না।

এই রোগের কারণে গত ৫-৬ বছর কোনো কাজ তো দূরের কথা, বাসা থেকে বের হওয়া বা ঘুমাতে পর্যন্ত পারে না সে। অন্যরা যাতে আতঙ্কগ্রস্ত না হয় সে জন্য কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে চলাচল করে সে। আবুল বাজনদার জানান, তার তিন বছরের একটি মেয়ে আছে। কিন্তু এই রোগের কারণে তাকে কোলে নিতে পারেন না। তিনি জানান, মাঝে মধ্যে হাতে প্রচণ্ড জ্বালা যন্ত্রণা করে। হাত-পা ওজন হয়ে গেছে, তাই চলতে পারেন না।

আবুল বাজনদারের এই করুণ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছেড়ে দিলে বিভিন্ন মহল থেকে সাহায্য–সহানুভূতির বার্তা আসতে থাকে। আবুলের চিকিৎসার জন্য গত রোববার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারি ও চট্টগ্রামের চিকিৎসক ডা. শরফুদ্দিনের সহায়তায় খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রফেসর ডা. আব্দুল ওয়াছেরের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড তাকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করেন।

মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা হলেন-গাজী মেডিকেলের পরিচালক প্রফেসর ডা. গাজী মিজানুর রহমান, অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. শৈলেন্দ্র নাথ মিস্ত্রি, ডা. বঙ্গকমল বসু, প্রফেসর ডা. মনোজ কুমার বোস, ডা. বরকত আলী, প্রফেসর ডা. বিশ্বজিত বসু ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রমেশ চন্দ্র সরকার। পর্যবেক্ষণের পর মেডিকেল বোর্ড আবুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক ইউনিটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেনের কাছে প্রেরণ করেন। শনিবার সকালে আবুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা বলছেন, এর আগে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে রোমানিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় মাত্র দু’জন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। ‘ইপিডারমোডি ইসপ্লাসিয়া ভেরোসিফারমিস’ নামক এক ধরনের ভাইরাসের কারণে রোগটি মানুষের শরীরে বাসা বাঁধে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলে ‘ট্রি ম্যান’ বা গাছ মানব। সম্পূর্ণ ভালো না হলেও আক্রান্তদের সার্জারির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে অনেকটাই ফেরানো সম্ভব।

হাসপাতালের বার্ন ইউনিট প্রধান অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, এ ধরনের অসুখ বাংলাদেশে এই প্রথম এবং গোটা বিশ্বে প্রবল। সরকারিভাবে তার মা ও তাকে ঢামেক বার্ন ইউনিটে রেখে সুচিকিৎসার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করবেন। রবিবার মেডিকেল বোর্ড গঠন করে কী ধরনের চিকিৎসা দেয়া যায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এটি মূলত চর্মজাতীয় রোগ বিধায় প্লাস্টিক সার্জনদের পাশাপাশি চর্ম বিশেষজ্ঞকে মেডিকেল বোর্ডে রাখা হবে। প্রয়োজনে ইন্দোনেশিয়া ও রুমানিয়ায় যে সকল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ওই দুই রোগীর অস্ত্রোপচার করেছিলেন তাদের সাহায্যও চেয়ে যোগাযোগ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ইতোপূর্বে এই রোগে আক্রান্ত ইন্দোনেশিয়ার এক রোগীর সন্ধান পেয়েছিল ডিসকভারি চ্যানেল। তাদের উদ্যোগে দুই বছর চিকিৎসার পর তার রোগ ভাল হয়ে যায়। তবে বেশি দিন তিনি জীবিত ছিলেন না।

নিউজটি শেয়ার করুন

1310 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ