জুন ২০, ২০১৫ ৯:২০ অপরাহ্ণ

মিয়ানমারের আচরণে উদ্বেক ও ক্ষোভ


বিজিবির সদস্য আবদুর রাজ্জাককে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা ধরে নিয়ে যাওয়ার চার দিন পরও ফেরত না দেওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগ ও হুমকির কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সরকারকে এ ব্যাপারে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন তারা।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে-যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। গত বুধবার ভোরে নাফ নদীতে বাংলাদেশের অংশে টহলরত বিজিবি সদস্যরা ইয়াবা চোরাচালান সন্দেহে একটি নৌকা তল্লাশি করতে চাইলে অন্য নৌকা থেকে বিজিপি সদস্যরা গুলি চালালে একজন আহত হন এবং আবদুর রাজ্জাককে তারা ধরে নিয়ে যায়।
সূত্র জানায়, বিজিবি ও বিজিপির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সকালে টেকনাফ স্থলবন্দরের ডাকবাংলোয় পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবে তা হয়নি।

বিকেলে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বিজিবির ওই সদস্যকে ফিরিয়ে দিতে এবং পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি সমাধানের আহ্বান জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশের কাছে পতাকা বৈঠকে বসার জন্য দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গতকাল রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল রাতে সকালের খবরকে জানান, বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক তত্পরতা চলছে। বিজিপির কর্মকর্তারা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে শিগগির রাজ্জাককে তারা ফেরত দেবে।

এর আগে ২০১৪ সালের ২৮ মে বান্দরবানের পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিপির সদস্যরা বিনা উস্কানিতে বিজিবির সদস্যদের ওপর গুলি চালায়। ওই সময় বিজিবির সদস্য নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। মিজানুরের লাশ ফেরত চেয়ে ৩০ মে বিজিবি ব্যাটালিয়নের আমন্ত্রণে পতাকা বৈঠকের কথা ছিল। কিন্তু মিজানকে ফিরিয়ে না দিয়ে তার
ওপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। পরে বিজিবিও পাল্টা গুলি চালায়।

মিজানের মৃত্যুর পর ৩ জুন ওই সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে আবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ৫ জুন মিয়ানমারের মংডুতে বিজিবি ও বিজিপির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠকও হয়। এই বিশেষ বৈঠকে তারা সুবেদার মিজানের হত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু পরদিনও সীমান্তে গুলিবর্ষণ অব্যাহত ছিল।
১৯৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাইক্ষ্যংছড়ির রেঙ্গুপাড়া বিওপিতে রাতের অন্ধকারে মিয়ানমারের নাসাকা আধা সামরিক বাহিনী তত্কালীন বিডিআরের বিওপিতে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছি। ওই হামলায় বিডিআরের একজন সদস্য নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছিল। লুট হয়েছিল বিওপির বেশ কিছু অস্ত্র, যা পরে বাংলাদেশের চাপে মিয়ানমার সরকার ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল এবং ওই ঘটনা ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছিল বলে দুঃখ প্রকাশ করেছিল তারা।

দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও সাড়া দেয়নি মিয়ানমার। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান ও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ১৫ জুলাই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেন সেইনের ঢাকা সফর চূড়ান্ত করা হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট সে সফর বাতিল করে দেন। তারপর থেকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাড়া দেয়নি মিয়ানমার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অতর্কিতে হামলা, তার বিশদ ব্যাখ্যা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এখনও খোলাসা করেনি বা তেমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে। কী নিয়ে বা কী কারণে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, তার ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, সম্প্রতি বিজিবি মিয়ানমারের মধ্যে গোলাগুলির যে ঘটনা ঘটল তাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত এবং এটা একটা হুমকিও বটে।

তিনি বলেন, এর পেছনে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু রয়েছে। বৈদেশিক বিষয়ে টানাপড়েন আছে মিয়ানমার, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের। আর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু। বিশেষ করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। বিভিন্ন বিদ্রোহী সংগঠনও এই টেকনাফ উপকূল ব্যবহার করছে। বহু বছর ধরে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করছে, তেমনভাবে সুসম্পর্ক গড়ে উঠছে না। সব মিলিয়ে এই উপকূলকে ঘিরে এ অঞ্চলে এক ধরনের উত্তেজনা চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, বিষয়টি আমাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এটা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ সরকারকে কড়া ভাষায় এর প্রতিবাদ জানানো উচিত।

তিনি বলেন, মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে অনেক বছর ধরেই আমাদের একটা বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও রোহিঙ্গা ইস্যু তাদেরই সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিনেও বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। এর পাশাপাশি মাদক চোরাচালান, মানবপাচারসহ অন্যান্য বিষয় তো রয়েছেই। এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশিদের ক্ষোভ : টেকনাফের নাফ নদী থেকে অপহরণের পর আবদুর রাজ্জাককে ফেরত না দিয়ে উল্টো তাকে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বিজিপির ফেসবুক পেজে।
ফেসবুকে শেয়ার করা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আবদুর রাজ্জাককে হাতকড়া পরানো অবস্থায় একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তার পরনে লুঙ্গি আর বিজিবির ইউনিফর্ম। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, তার সামনে কিছু অস্ত্র রাখা। রাজ্জাকের মুখে আঘাতের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। তার নাকের কাছে ক্ষতচিহ্ন এবং শুকিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।
ফেসবুকে প্রকাশিত এই ছবি বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে। অনেকেই ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করছেন এবং আটক সীমান্তরক্ষীর সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ তুলছেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে।

গতকাল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বিজিবি সদস্য অপহরণের ঘটনা জাতির জন্য ‘লজ্জা’।
ফেসবুকে এমএম আমিনুর রহমান লিখেছেন, বার্মার মতো দুর্বল একটি দেশের সীমান্তরক্ষীরা ধরে নিয়ে বেঁধে রেখেছে? এই লজ্জা দেশের, এই লজ্জা পুরো জাতির।
আরাফাত সিদ্দিকী নামে আরেকজন লিখেছেন, আমাদের বিজিবি সদস্য নায়েক রাজ্জাকের শিকল দিয়ে হাত বাঁধা ছবিটি যতবার চোখে পড়ছে ততবারই মনে হচ্ছে, মিয়ানমার বাহিনী আমাকেই বেঁধে রেখেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ