মে ২০, ২০১৮ ৮:২৯ অপরাহ্ণ

মাহে রমাদান – সাহ্‌রির ফজিলত ও বরকত


রমাদানের পাঁচটি সুন্নতের অন্যতম হলো সাহ্‌রি বা ভোররাতের খাবার গ্রহণ করা। মধ্যরাতের পর থেকে সুবেহ সাদেক তথা ফজর ওয়াক্তের পূর্বের সময়টাকে সাহ্‌রি বলা হয়। মোল্লা আলী কারি (র.) বলেন, ‘অর্ধ রাত্রি হতে সাহ্‌রির সময় শুরু হয়। (মিরকাত শরহে মিশকাত)। ইমাম জামাখ্শারী (র.) ও ফকিহ আবুল লাইছ সমরকন্দী (র.) বলেন, সাহ্‌রির সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। সাহ্‌রি বিলম্বে খাওয়া সুন্নত। তবে সন্দেহের সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না, সাহ্‌রির নিরাপদ সময়সীমার মধ্যে পানাহার শেষ করতে হবে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলে কারিম (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা সাহ্‌রি খাও; যদি তা এক ঢোঁক পানিও হয়।’ অন্যত্র বলেছেন, ‘তোমরা সাহ্‌রি খাও; যদি এক লুকমা খাদ্যও হয়।’ উপরিউক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা সাহ্‌রির গুরুত্ব বোঝা যায়। এক ঢোঁক পানি, এক লুকমা খাদ্য, এক কাপ দুধ সামান্য ফলমূল বা একটি খেজুরের মতো যত্সামান্য হলেও সাহ্‌রি গ্রহণ করা সুন্নত।

ইসলামের পরিভাষায় রোজা বা সিয়াম পালন করার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে পানাহার করাকে সাহ্‌রি বলা হয়। ইসলামি আইনশাস্ত্রের দৃষ্টিতে ইহা সুন্নত হলেও প্রকৃত তাকওয়া অর্জন এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য এর গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেন: ‘তোমরা সাহ্‌রি খাও, কেননা সাহ্‌রিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি, সওম অধ্যায়, হাদিস: ১৮০১)। হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘আমাদের রোজা আর আহেল কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহ্‌রি খাওয়া আর না খাওয়া।’ (মুসলিম, আলফিয়াতুল হাদিস, পৃষ্ঠা: ১৩১)।

বরকতময় সাহ্‌রির কল্যাণকর নানা দিকসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: সুন্নতের অনুসরণ, ইসলামের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা, ইবাদতের জন্য শক্তি এবং তাকওয়া অর্জন, স্বাস্থ্য ও মনের অধিক প্রফুল্লতা লাভ, ক্ষুধার তাড়নায় সৃষ্ট প্রবৃত্তির বাসনা নিবারণ। যারা একত্রে বসে সাহ্‌রি খায়, তাদের প্রতি সৌহার্দ্যের বরকত অবতরণ। সাহ্‌রির সময় দোয়া কবুলেরও সময়; এ সময় অধিক জিকির-আজকার, তাহাজ্জুদ আদায় ও দোয়া-মোনাজাতের সুযোগ লাভ হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে সাহ্‌রি বর্জন করা ঠিক নয়, সুন্নতের খেলাপ।

সাহ্‌রি খাওয়া সমস্ত দিন রোজা রাখার জন্য অত্যন্ত সহায়ক, সাহ্‌রির সময় জাগ্রত হওয়া রোজার প্রতি আগ্রহের যথেষ্ট প্রমাণও বটে। সাহ্‌রির সময় আরামের নিদ্রা বর্জন করে জাগ্রত হওয়া প্রকৃতপক্ষে ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি অনুরাগ। এতে শেষ রাতে জাগ্রত হওয়ার অভ্যাস হয়, তাহাজ্জুদ আদায়ের সৌভাগ্য লাভ হয়। সাহ্‌রির সময় জাগ্রত হওয়া একপ্রকারের মুজাহাদা বা সাধনাও বটে। এই সময় আল্লাহর রহমত নাজিলের সময়, অগণিত আল্লাহর প্রেমিকের ফরিয়াদের সময়, আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বাপেক্ষা উত্তম সময়। যাঁরা এই বরকতের সময় জাগ্রত হয়ে আল্লাহর মহান দরবারে মোনাজাত করে থাকেন এবং ইস্তিগফার করেন, আল্লাহ তাঁদের স্বীয় ভালোবাসায় ধন্য করেন। এই ধরনের আল্লাহর প্রেমিকদের লক্ষ্য করে পবিত্র কোরআনুল কারিমে মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, তারা (ইমানদারগণ) রাত্রির শেষ অংশে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার করে থাকে। (সুরা-৫১ যারিয়াত, আয়াত: ১৮)।

রোজা বা সওম মানে হলো পানাহার থেকে বিরত থাকা; তাই সাহ্‌রিতে বেশি পরিমাণে খাওয়া ঠিক হবে না। রমাদান যেন ভোজের আয়োজনে পরিণত না হয় তা দেখতে হবে। সাহ্‌রিতে স্বাস্থ্যসম্মত আহার গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। অধিক পরিমাণে তরল ও পানীয় গ্রহণ করা উচিত। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পথ্য চিকিত্সকের পরামর্শ মতো গ্রহণ করতে হবে। শরীর ও মন ভালো থাকলে ইবাদত আনন্দময় হয়।

ফরজ গোসল করে সাহ্‌রি খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় যদি না থাকে; তখন অজু করে বা হাত-মুখ ধুয়ে আগে সাহ্‌রি খেয়ে নেবেন। পরে গোসল করে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। কারণ সাহ্‌রি খাওয়ার জন্য পবিত্রতা ফরজ নয় বরং সুন্নত; আর নামাজ আদায় করার জন্য পবিত্রতা ফরজ।
গোসল ফরজ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা করে নিতে হবে, বিনা ওজরে বেশি সময় অপবিত্র অবস্থায় থাকা অসমীচীন; আর রমাদানে রোজা অবস্থায় অধিকক্ষণ অপবিত্র থাকা মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়, এটি মকরুহ। সাহ্‌রি খাওয়া সম্ভবপর না হলেও রোজা রাখতে হবে। নিজেরা সাহ্‌রি খাওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অভাবী অসহায় মানুষদের সাহ্‌রি খাওয়ার বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

114 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ