জুন ২৯, ২০১৭ ৮:০১ অপরাহ্ণ

মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা – প্রধান ফটক থেকে ফিরছেন পর্যটক


এ.জে লাভলু, বড়লেখা প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের বড়লেখার মাধবকু- জলপ্রপাতে প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের ছুটিতে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে। এতে ইজারাদার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সারা বছরে দুই ঈদে ব্যবসায়ীদের একটু বাড়তি বিকিকিনি হয়। এজন্য তারা ধার-দেনা করেও দোকানে মালামাল তুলে থাকেন। এবারেরও ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বিকিকিনি ভালো হবে, এমন আশায় বুক বেধেছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। সাম্প্রতিক ভারি বর্ষণে মাধবকু-ের টিলা ও রাস্তা দেবে যাওয়ায় অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশাসন গত বৃস্পতিবার (২২ জুন) থেকে মাধবকু- জলপ্রপাতে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ফলে গত কয়েকদিন থেকে অনেক দূর-দুরান্ত থেকে মাধবুক- জলপ্রপাতে বেড়াতে গিয়ে পর্যটকরা প্রধান ফটক থেকেই ফিরে গেছেন। আর এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন ইজারাদার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এদিকে, ঈদের দিন সোমবার বিকেলে মাধবুক- পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়ার দাবীতে আগত পর্যটকরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
ইজারাদার সূত্রে ও সরেজমিনে বুধবার (২৮ জুন) সকালে মাধবকু- ইকোপার্কের গেলে প্রধান ফটক তালাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। ঈদের দিন সোমবার মাধবকু-ে প্রায় ২ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে। কিন্তু পুলিশ তাদের ইকোপার্কের ভেতরে প্রবেশ করতে না দেয়ায় তারা অনেকটা নিরাশ হয়ে ফিরে গেছেন। এছাড়া পর্যটন পুলিশ মাধবকু- জলপ্রপাত এলাকা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে কাঁঠালতলী বাজারে পর্যটকদের জলপ্রপাত এলাকায় প্রবেশে নিষেধ ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহিত করতে দেখা গেছে। ফলে বুধবার মাধবকু- এলাকা পর্যটক শূন্য থাকতে দেখা গেছে।

সিলেট থেকে মঙ্গলবার দুপুরে মাধবকু-ে বেড়াতে এসেছিলেন কলেজ শিক্ষার্থী হোসাইন আহমদ, কামাল আহমদ, ফাহিম আহমদ, আমিনুল ইসলাম। জলপ্রপাতে প্রবেশ করতে না দেয়ায় তারা অনেকটা নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। এসময় কথা হয় তাদের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে খুব আশা করে বন্ধুরা মিলে মাধবকু-ে বেড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এজন্য ফিরে যাচ্ছি।’
এদিকে, ভরা মৌসুমে পর্যটক না থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। মাধবকু-ের গ্রামীণ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘গত ঈদে এমন সময় কম হলেও ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিকিকিনি হয়েছিল। কিন্তু এবার অবস্থা খুব খারাপ।’ তিনি ক্যাশ খুলে দেখালেন সারা দিনে মাত্র ১’শ টাকা বিক্রি করেছেন। গ্রামীণ রেস্টেুরেন্টের পাশের দোকান মীম ঝিনুক এন্ড কসমেটিক্সের দোকানে কর্মচারীর কাজ করেন জাহেদ আহমদ ও এবাদ আহমদ। তারা বলেন, ‘দোকান মালিক এ বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার মালামাল তুলেছেন। সারাদিনে প্রায় ১ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে। তারা আরও বলেন, ‘দোকানে আমরা মোট ১৬ জন কর্মচারী কাজ করি। গত ঈদে ধম ফেলার সময়টুকু ছিল না। কিন্তু এবারের ঈদে মাধবকু-ে পর্যটক না আসায় আমরা মাত্র ছয়জন কর্মচারী দোকানে কাজ করছি। বিকিকিনি না থাকায় বাকি কর্মচারীরাও আসেনি।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন, এমরান হোসেন, রাজুল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম, শামীম আহমদ, আলী হোসেন, স্বপন আহমদ, আবুল হোসেন, হেলাল উদ্দিন, বেলাল আহমদ জানান, মাধবকু-ে সবমিলেয়ে মোট ৬০টি দোকান রয়েছে। সারা বছরে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বিকিকিনি একটু ভালো হয়। এবছর তারা বিকিকিনি ভালো হওয়ার আশায় ধার-দেনা করে দোকানগুলোতে লাখ লাখ টাকার মালামাল তুলেছিলেন। কিন্তু মাধবকু-ে পর্যটক না আসায় তারা মন্দা সময় কাটাচ্ছেন। তারা মাধবকু- জলপ্রাতের রাস্তা দ্রুত মেরামত করে পর্যটকদের জন্য গেট খুলে দেয়ার জোর দাবী জানান।
ইজারাদার জুনেদে আহমদ ও রিফাত আহমদ বলেন, ‘বনবিভাগ ইকোপার্ক থেকে বছরে ৩০-৩৫ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করছে। ঈদের আগে ও পরে ১০-১৫ দিন হাজার হাজার পর্যটক আনন্দ উপভোগে এখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে আসেন। ১৫ দিন আগের বর্ষণে রাস্তায় সামান্য ফাটল আর অল্প দেবে যাওয়া মেরামতে বনবিভাগ চরম উদাসীন। দেশের দূরদুরান্তের পর্যটকের দুর্ভোগের কথা তারা মোটেও চিন্তা করেনি। কোন পূর্ব প্রস্তুতি নেয়নি। বর্ষাকালে অতীতেও মাধবকু-ের রস্তা-ঘাট বিধস্ত হয়েছে। কিন্তু ইকোপার্ক বন্ধ করার ঘটনা ঘটেনি। তারা অবিলম্বে পর্যটকের জন্য মাধবকু-ের তালা খুলে দেয়ার দাবী জানান।’
এ ব্যাপারে মাধবকু- পর্যটন পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গির আলম বলেন, ‘জননিরাপত্তা ও অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে বন বিভাগ জলপ্রপাত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশের প্রধান ফটক ছাড়াও কাঁঠালতলী বাজারের সামনে পর্যটকদের সতর্ক করে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যানার টাঙানো হয়েছে। ঈদের ছুটিতে অনেক দূর থেকে মানুষজন হাজার হাজার টাকা খরচ করে মাধবকু-ে বেড়াতে আসছেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি না থাকায় তাদরেকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। গেট থেকেই ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে নিজেরও খারাপ লাগছে।’
এ ব্যাপারে বনবিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঈদ ছুটির কারণে শ্রমিক না থাকায় সংস্কার কাজ বন্ধ রয়েছে। কাজ শেষে অভ্যন্তরীণ রাস্তা পর্যটকের চলাচলের উপযোগী করেই ইকোপার্কের গেট খুলে দেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক ভারি বর্ষণে মাধবকু- ইকোপার্কের সড়কের পর্যটন রেস্তোরাঁ এলাকার কাছে প্রায় ৪০ ফুট জায়গা প্রায় দুই ফুটের মতো নিচের দিকে দেবে যায়। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় তা ক্রমশই দাবছে। এছাড়া রোস্তারাঁর কাছে উপরে উঠার সিঁড়ির বামপাশের নিচের প্রায় ৪০ ফুট এবং জলপ্রপাতের কাছে নামার সিঁড়ির ডান পাশের নিচের প্রায় ৩০ ফুটের মতো জায়গার মাটি সওে গেছে। এতে ইকোপার্কের সড়ক ও সিঁড়ি দুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। ফলে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত এলাকাটি পর্যটকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন গত বৃস্পতিবার (২২ জুন) থেকে মাধবকু-ে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা মাধবকু-।

নিউজটি শেয়ার করুন

723 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ