ডিসেম্বর ১২, ২০১৫ ২:০৫ অপরাহ্ণ

ডিসেম্বরেই ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি, পদের দৌড়ে অপরাধীরাও


নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পাওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর অবশেষে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। চলতি মাসের যেকোন দিনই ঘোষণা আসতে পারে পূর্ণাঙ্গ এ কমিটির। আর এ নিয়েই এখন শেষ মুহূর্তের জোর লবিং-তববির চালিয়ে যাচ্ছেন পদপ্রত্যাশীরা। পদের দৌড়ে চিহ্নিত অপরাধীরা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে চমক থাকছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এ বছরের ২৫ ও ২৬ জুলাই কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যথাক্রমে মো. সাইফুর রহমান সোহাগ ও এস এম জাকির হোসাইন দায়িত্ব নেন। এরপরই শোকাবহ আগস্ট মাসের মাসব্যাপী কর্মসূচি ও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুড়িগ্রাম ও বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় দুই নেতা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরইমধ্যে ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ পুরাদমে এগিয়ে নিয়েছেন তারা। এ লক্ষে ইতোমধ্যোই সোহাগ-জাকির একাধিকবার নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে দেনদরবারও করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও একাধিকবার সাক্ষাৎ করে ছাত্রলীগের সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে এসেছেন। নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ও নির্দেশনা।

ছাত্রলীগের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া এখন প্রস্তুত। সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ কয়েকদিন আগে চীন থেকে দেশে ফিরেছেন। তবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম এখনো থাইল্যান্ডে রয়েছেন। এ নেতার দেশে ফেরা ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি লিয়াকত শিকদারের অথবা হাইকমান্ডের সবুজ সঙ্কেত পাওয়া গেলেই ঘোষণা করা হবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে শোনা যাচ্ছে চলতি মাসের ১৩ বা ১৫।

সূত্র আরো জানায়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি ২৫১ সদস্যের হলেও এখনই সম্পূর্ণ কমিটি গঠন করতে অনাগ্রহী সোহাগ-জাকির। সেক্ষেত্রে ২০০ সদস্যের কমিটিও আসতে পারে।

এদিকে সম্মেলনের ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। অনেকে হতাশাও ব্যক্ত করছেন। কেননা একাধিকবার কমিটি ঘোষণার আওয়াজ উঠলেও হালে তা পানি পায়নি। এবার আর হতাশ হতে চান না তারা। কর্মীদের বিশ্বাস ডিসেম্বরে বিজয় দিবসের আগেই ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।

কমিটি পূর্ণাঙ্গের ব্যাপারে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বাংলামেইলকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটির কাজ শেষ পর্যায়ে। চলতি ডিসেম্বর মাসেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে।

পদের দৌড়ে চিহ্নিত অপরাধীও
২৮তম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সোহাগ-জাকির কমিটি গঠনের পরপরই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নিজেদের জায়াগা নিশ্চিত করতে লবিং-তদবির শুরু করে দেন পদপ্রত্যাশীরা; চলতি মাসে যা আরো বেড়েছে। সোহাগ-জাকিরের বাসা থেকে শুরু করে সবখানে সার্বক্ষণিক তারা শ’খানেক মোটরবাইক নিয়ে মহড়া দিচ্ছেন। ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচি, কেন্দ্রীয় কার্যালয়, মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার বাসায় থাকছে তাদের সরব উপস্থিতি।

পদ-পদবী প্রাপ্তির দৌড়ে আছেন সাবেক কমিটির কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী এবং বিতর্কিত নেতাও। পদ পেতে তারা জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক নিষ্ক্রিয় ছাত্রলীগের নেতাও নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর পদের দৌড়ে এগিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো নিয়ে সোহাগ-জাকিরসহ মাঠের সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা একাধিকবার বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

বিতর্কিত আবার পদের দৌড়ে আছেন এমন নেতাদের একজন- সংগঠনটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন আনু। ছাত্ররাজনীতিতে তিনি একাধিকবার ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। তার নামে হলে অবৈধ লোকজনসহ অবস্থান, চাঁদাবাজিসহ ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার বিস্তর অভিযোগ আছে। এছাড়া সদ্য সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক কাজী এনায়েতের নামে গত ঈদে শাহবাগ ফুল মার্কেটের দোকান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। তিনিও আছেন পদের দৌড়ে।

অনেকের বিরুদ্ধে আছে মাদকদ্রব্য সেবন ও ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ। এদের মধ্যে আছেন- এসএম হলের সভাপতি মেহেদি হাসান, সাধারণ সম্পাদক দিদার মুহাম্মদ নিজামুল ইসলাম, মহসিন হলের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান, আপেল মাহমুদ সবুজ, মাহবুবুল ইসলাম প্রিন্স, এফ এইচ হলের সভাপতি হাসানুজ্জামান হাসান, শহীদুল্লাহ হলের সভাপতি আমিনুল ইসলাম, বিজয় একাত্তর হলের সাধারণ সম্পাদক শাহদত হোসেন।

গত তিন বছরে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, টেন্ডারবাজি, বিভিন্ন অপরাধ কর্মে জাড়িত থাকা, চাকরিতে যোগদান, বয়স জালিয়াতি, অছাত্র, বিবাহিত এমনকি ডিভোর্সের অভিযোগও আছে সদ্য সাবেক একাধিক নেতার বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে আছেন বঙ্গবন্ধু হলের শেখ নূর কুতুবুল আলম, আনসারুল হক কায়েস, স্যার এফ রহমান হলের রুহুল হক আসাদুজ্জামান জনি, কবি জসিম উদ্দীন হলের বিএম এহতেশাম, এফএইচ হলের মাহমুদুল হাসান রাকিব, সূর্যসেন হলের আরেফিন সিদ্দীক সুজন, জিয়া হলের সালমান প্রধান শাওন, জহুরুল হক হলের রিফাত জামান, আতিক রহমান, এ এস এম মাসুম, জগন্নাথ হলের সুপ্রিয় কুন্ডু রাজেশ, সজীব বিশ্বাস, জসীমউদ্দীন হলের এনায়েত হোসেন রেজা, এফ এইচ হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, শামছুন্নাহার হলের নিশীতা ইকবাল নদী, রওশন আরা নিতুল, কুয়েত-মৈত্রী হলের সাধারণ সম্পাদক লিসা চিরণ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ এম শরিফুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, ঢাকা কলেজের সাকিব হাসান সুইম, গালিব হক, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের শাকিরুল ইসলাম পিয়াস, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসেল আহমেদ রাজীব প্রমুখ।

এদের অনেকেই বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন।

পদের দৌড়ে বিতর্কিতদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বাংলামেইলকে বলেন, ছাত্রলীগ একটি বৃহৎ ছাত্র সংগঠন। অনেক নেতাকর্মীই বিভিন্ন কারণে ভুল পথে পা দিয়ে থাকে। তবে নতুন কমিটিতে বিতর্কিতদের জায়গা দেয়া হবে না। তাই পদপ্রত্যাশীদের বায়োডাটা যাচাই-বাছাই, অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের মধ্যদিয়েই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। বিতর্কিত নয় বরং ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নতুন অনেক চমক থাকছে।

শঙ্কার দোলাচল
এদিকে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নিজেদের মূল্যায়ন নিয়ে শঙ্কা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে ছাত্রলীগের বিশাল একটি গ্রুপ। সদ্য সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুল কবির রাহতের অনুসারী ছিল বিশাল এই গ্রুপটি। রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকলেও কাউন্সিল কেন্দ্রীক গ্রুপিংয়ের মারপ্যাঁচে কোণঠাসা গ্রুপটি এখন নিজেদের অবস্থান, পদ, রাজনীতির সুযোগ নিয়ে আছেন শঙ্কায়।

তাদের চাওয়া, বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলকেন্দ্রীক গ্রুপিংয়ের কথা ভুলে গিয়ে বিগত দিনের মাঠে সক্রিয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

268 বার মোট পড়া হয়েছে সংবাদটি
error: আপনি কি খারাপ লোক ? কপি করছেন কেন ?? হাহাহ